পূর্বাচলে ‘লুটের সাম্রাজ্য’—আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের ছত্রছায়ায় উজ্জ্বল মল্লিক ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আবারও আলোচনায় প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিক। অভিযোগের তীর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বিস্তৃত হয়েছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক বা ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্র’-এর দিকে—যাদের ছত্রছায়ায় তিনি বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে প্রকল্পের নকশা, টেন্ডার, বিল পরিশোধ ও প্লট বরাদ্দে প্রভাব খাটিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।


বিজ্ঞাপন

পাঁচ সিনিয়রকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলী : অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এবং রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান-এর প্রভাব খাটিয়ে উজ্জ্বল মল্লিক পাঁচজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসেন। নিয়োগবিধি অনুযায়ী ‘তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী’ পদে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক হলেও তাঁর ক্ষেত্রে তা পূরণ হয়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে।

পরবর্তীতে পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে রাজউকের এক অফিস আদেশে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর পদ থেকে নামিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়। অফিস আদেশে ‘অসদাচরণ’ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।


বিজ্ঞাপন

পূর্বাচল প্রকল্প: নকশা বদলে ‘লুটের ছক’ ?  পূর্বাচল প্রকল্পে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ লেক থাকার কথা। প্রকল্প প্রোফাইলে সারা বছর পানি সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যবাহী পালতোলা নৌকা চলাচলের পরিকল্পনাও ছিল।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু অভিযোগ—ডিজাইনে ব্যত্যয় ঘটিয়ে সেতুর ডেক নিচু করা হয়েছে, ফলে নৌ চলাচল প্রায় অকার্যকর। এতে প্রকল্পের সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন মৌজায় ভিন্ন ভিন্ন আর-এল (রিডিউসড লেভেল) নির্ধারণের কথা থাকলেও ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে তা সমান করা হয়েছে—উপরের মাটি নিচে ভরাট দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ।

লেক ভরাট, ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা ও ১৫০ কিলোমিটারের বেশি ড্রেন নির্মাণ—সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিল পরিশোধ প্রক্রিয়ায় তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

টেন্ডার কারসাজি ও ‘পছন্দের’ ঠিকাদার : অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার ডকুমেন্টে তথ্যের ঘাপলা করে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি প্যাকেজে প্রথম টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত বদলে দ্বিতীয়বারের ‘টিইসি’ দিয়ে পছন্দসই ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ—‘ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার কাজ দেওয়া। প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহাবুবুল আলম হানিফ-এর নেপথ্য মালিকানাধীন—এমন জনশ্রুতি রয়েছে। অভিযোগ আছে, পিপিআর ২০০৮ লঙ্ঘন করে ডিপিএম পদ্ধতিতে সরাসরি ক্রয় দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়।

দুদকের অনুসন্ধান: আলোর মুখ দেখেনি কেন ?  পূর্বাচল প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে নথি তলব করে। তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিমও গঠন করা হয়। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে পর্যন্ত অনুসন্ধান কার্যত স্থবির ছিল—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলের। রাজউকের একাধিক সূত্রের দাবি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশ্রয়ে তদন্তে গতি আসেনি।

নিজ নামে প্লট: ২০ কোটির জমি ৩৭ লাখে ?  সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ—পূর্বাচলের ৫ নম্বর সেক্টরে বাণিজ্যিক ব্লকের পাশে আরবান ইউটিলিটি ফ্যাসিলিটির (ইউইউএফ) জায়গা নকশা পরিবর্তন করে ৭ কাঠার একটি প্লট সৃষ্টি এবং তা নিজের নামে বরাদ্দ নেওয়া। সরকারি কোষাগারে জমা হয় মাত্র ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, অথচ বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা বলে দাবি স্থানীয়দের।

অভিযোগ—প্লটের শ্রেণি পরিবর্তন করে আবাসিক দেখানো হয়, যাতে কম দামে বরাদ্দ সম্ভব হয়। একইভাবে আরেকটি প্লট প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মালিকের স্ত্রীর নামে বরাদ্দ হয়। ফলে রাজউক প্রায় ১৯ কোটি টাকার রাজস্ব হারায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

অতীতের বিতর্ক: তেজগাঁও ওভারপাস ট্র্যাজেডি : ২০০৭-০৮ সালে বিজয় সরণি–তেজগাঁও রেলক্রসিং ওভারপাস প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে ১৩ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায়ও তাঁর নাম উঠে আসে। অভিযোগ—অভিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ না করা ও তদারকির ব্যর্থতার কারণে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত কোনো দণ্ডাদেশের তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্নের মুখে ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্র’ : সমালোচকদের ভাষ্য, উজ্জ্বল মল্লিক একক নন; বরং তিনি একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক-প্রশাসনিক চক্রের অংশ—যেখানে তৎকালীন মন্ত্রী, রাজউক চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালকদের সমন্বয়ে পূর্বাচল প্রকল্পকে ‘দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য’ বানানো হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে উজ্জ্বল মল্লিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি, অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রমাণহীন।

উপসংহার : পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প ছিল রাজধানীর পরিকল্পিত সম্প্রসারণের এক মহাপরিকল্পনা। কিন্তু যদি অভিযোগের সামান্য অংশও সত্য হয়, তবে এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়—নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও নজির। এখন প্রশ্ন—দুদকের চলমান অনুসন্ধান কি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে, নাকি প্রভাবশালী ‘চক্র’-এর দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আবারও থেমে যাবে?

👁️ 57 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *