
নিজস্ব প্রতিবেদক : গভীর শোক ও শ্রদ্ধার আবহে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যসম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহানারা আরজু। আজ সোমবার (২ মার্চ ২০২৬) দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই মহীয়সী নারী। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনি এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মাননীয় বিচারপতি জনাব মোঃ আশফাকুল ইসলাম মহোদয়ের শ্রদ্ধেয় মাতা। তাঁর স্বামী মরহুম এ কে এম নুরুল ইসলাম ছিলেন বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রপতি, আইনমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, পাকিস্তান আমলে ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার—যা তাঁদের পরিবারকে দেশের রাজনৈতিক ও বিচারাঙ্গনের ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর জন্ম নেওয়া জাহানারা আরজু শৈশব-কৈশোর থেকেই সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। মাত্র কিশোরী বয়সে, ১৯৪৫ সালে ‘আজাদ’ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিল’ বিভাগে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এরপর ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’, ‘বেগম’, ‘মিল্লাত’ ও ‘ইত্তেহাদ’সহ তৎকালীন খ্যাতিমান সাময়িকীগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ।

বাংলা সাহিত্য-সম্পাদনার ইতিহাসেও তিনি এক অগ্রদূত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নারীসম্পাদিত সাহিত্যধারায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর সম্পাদনা ও সাহিত্যকর্মে ছিল প্রখর মনন, মানবিক বোধ ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর।

জাহানারা আরজুর কাব্যজগৎ ছিল মানবতাবোধ, প্রকৃতিপ্রেম ও সমাজসচেতনতার অনন্য মেলবন্ধন। মাটি, মানুষ ও সময়ের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে তিনি সহজ, স্বচ্ছ ও আবেগঘন ভাষায় রূপ দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় যেমন ছিল অন্তর্গত বেদনার নীরব অনুরণন, তেমনি ছিল আশাবাদ, আলোকিত মানবিকতা ও জীবনমুখী দৃষ্টির দীপ্ত প্রকাশ।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি মোট ২৬টি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ও রচনাবলি বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আগামী প্রজন্মের সাহিত্যপথিকদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। মরহুমার প্রথম নামাজে জানাজা আজ বাদ মাগরিব গুলশানের আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে।
দ্বিতীয় জানাজা বাদ ঈশা ও তারাবির নামাজের পর মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানাধীন খলিলপুর নিজ গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাঁকে সেখানেই স্বামীর কবরের পাশে দাফন করা হবে।
বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর প্রস্থান এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করল। কবিতার স্বচ্ছ নদীর মতো প্রবহমান এক জীবন আজ থেমে গেলেও, তাঁর সৃষ্টির দীপ্তি ও মানবিকতার আলো বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে দীর্ঘদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
