বাবা দিবসে বাবা আমার বাবা

জাতীয় জীবন-যাপন

শারমিন সুখী : মাত্র ১৩ বৎসর বয়েসে বাবাকে হারিয়েছি! বাবা (খন্দকার রফিকুল ইসলাম) আমার কাছে এখনো স্বপ্নের মতো! দুর্দান্ত আধুনিক, স্টাইলিস্ট, রুচিশীল , সৌখিন, জ্ঞানী, মানবিক , সংস্কৃতমনা ছিলেন!

যখন কবিতা আবৃতি করতেন, ‌বলো বীর বলো চির উন্নত মম শির কিছু বুঝতাম না কিন্তু কেঁপে উঠতাম তার কবিতা শুনে! তার হাতের লোমকূপ দেখতাম শিহরিত হয়ে ফুলে উঠছে আবেগে!

একবার জসীমউদ্দীনের কবর নাটক তিনি তার অফিসার্স প্রোগ্রামে মঞ্চস্থ করলেন! যখন বুড়ো সেজে এক বাচ্চা কে হাত ধরে বলে উঠলেন ঐ খানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে মনে আছে সবাই হু হু করে কেঁদে ফেলেছিলেন হলের!

এতো গান পছন্দ করতেন গানের ক্যাসেট ভর্তি ছিল শোকেজ! হুইলে মাছ মারা তার শখ ছিল, মনে আছে একবার এতো বড় মাছ ধরে এনেছিলেন যে তার একটা আসই এতবড়ো ছিল যে অবাক হয়েছিলাম সারা অফিসার্স কোয়াটার এ আম্মু এই মাছ বিলি করেছিলেন!

আমাদের শেখাতেন মাছ মারা, কবিতা, ওস্তাদ রেখে গান, এগুলি তখন টর্চার মনে হতো! স্কুল প্রোগ্রামে তখন ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়া ছিল ওয়ান টু! সাথে নিয়ে কেরাম খেলতেন মেতে উঠতেন বাচ্চাদের মতো ! টিভি দেখতেন সাথে নিয়ে সব ভালো অনুষ্ঠান গুলো!

আবার শবে বরাতের রাতে সাথে নিয়ে নামাজ পড়তেন! ঘুম আসলে বলতেন যাও ঘাড়ে পানি দিলে ঘুম চলে যাবে! কেনাকাটায় ছিলেন সৌখিন বাজারের শ্রেষ্ট জিনিস তার চাই ই চাই! কলাম লিখতেন পত্রিকায়! কত বই যে পড়তেন!

প্রতি উইকেন্ড এ বাইরে বের হতেন সাথে নিয়ে উদ্দেশ্য শপিং শেষে বাইরে লাঞ্চ বা ডিনার, দামি আইসক্রিম পার্লারে আইসক্রিম, সিনেমা হলে যেয়ে দেখা! কলেজে জীবনে রাজনীতি করতেন ভিপি ছিলেন! কোনোদিন বলেন নি তিনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন !

জানতে পেরেছি পাঁচ ছয় বছর আগে , তোফায়েল চৌধুরির সাইন করা মুক্তিযুদ্ধ সার্টিফিকেট ও প্রত্যায়ন পত্র আবিষ্কার ই করেছি এই সেদিন ! বাবা হয়তো সবার আছে ! সব বাবাই তার সন্তানকে ভালোবাসে !

কিন্তু আমার বাবার মতো সন্তানের প্রতিটি মুহূর্তে মিশে থাকা বাবা আমি দেখি নি ! তিনি সন্তানের প্রতিদিন রঙিন করে দারুন ভাবে উদযাপন করতেন ! প্রতিটি ক্ষনে ও মুহূর্তে মিশে থাকতেন !

হয়তো ক্ষণজন্মা ছিলেন বলেই প্রতিটি মুহূর্ত সন্তানদের সাথে উদযাপন করে গেছেন ! তিনি মারা গেছেন আমাদের এখন যা বয়স এই বয়সে !

আমি বড় সন্তান ছিলাম ! আমার মায়ের সংসার জীবন মাত্র ১৩ বছর ! বাবা দিবসে আমার স্বপ্নের বাবা কে আমি তাই স্বপ্নেই রাখি , স্বপ্নেই দেখি !

বাবা আমার বাবা কতদিন কতকাল দেখিনি তোমায় ! কেউ বলে না তোমার মতো আয় কাছে আয় !

বাবা মানেই আজ স্বপ্ন !! বাবা মানেই ছিল উইক এন্ডে ঘুরাঘুরি, শিশুপার্ক , চাইনীজ ।

বাবা মানেই ছিল কবিতা, গান, অভিনয়ে প্রথম পুরস্কার। বাবা মানেই ছিল একুরিয়াম ভর্তি লাল নীল মাছ।বাবা মানেই ছিল বাজারের সবচাইতে ফ্যাশানেবল জামা।

বাবা মানেই ছিল বাজারের সবচাইতে বড় মাছ, ভাত খেতে দুই চারটা ইলিশ মাছের পেটি। বাবা মানেই ছিল সুখ ভর্তি বিলাসী জীবনযাপন । বাবা নেই সেই ১৯৮৭ সাল থেকে; হয়তো বাবা আসেন আমার স্বপ্নে এইসব জীবন ফেরত দিতে।

যেন ভুলে কোথাও ভুল করে চলে গেছেন, উনি ফিরে এসে বলেন আমি মরি নাই তো; অতঃপর আমাদের মিলনের কান্নাকাটি শেষে, অনেকদিন তাঁর সাথে ঘোরা হয়নি বলে নিয়ে যান সদলবলে সিনেমাতে, দামি আইসক্রিম পার্লারটিতে, চাইনিজ এ ।

সে আমার কাছে বার বার জীবিত হয়ে ফেরত আসেন; কারন তাঁর মরা মুখটি শেষঅব্দি দেখার সুযোগ ও দুর্ভাগ্য আমার হয়নি বলে। তাকে হেঁটে হেঁটে যে এগিয়ে দিয়েছিলাম এই তাঁর সাথে আমার শেষ স্মৃতি।হেঁটে হেঁটে এগিয়ে দেয়া সকল বিলাসী সুখের সমাপ্তি ।

আমার নানা জেলার ছিলেন তার মত ভালো মানুষ পৃথিবী তে কোনদিন জন্মে নি এবং কোন দিন জন্মাবে না, কেননা ফেরেশতা রা জন্ম নেয় না ভূল করে পথ ভূলে টুপ করে পড়ে যায়!!
তার মৃত্যু এত অসাধারণ এত সুন্দর মৃত্যু আমি দেখি নি কোনদিন এত বয়স এও!
আমার দাদা কৃষি অফিসার ছিলেন তিনি তার সঙ্গ তেমন পাই নি !!
তোমরা ভালো থাকো, যেখানেই থাকো, সব বাবারা , আমি একটা বাবা পেয়েছি। আমার শ্বশুর তার জন্যে দোয়া করো. তোমরা !!

বাবা তোমার স্বল্প জীবনকাল নিয়ে তার দীর্ঘ জীবন যেন ব্যালান্স হয়!! আমীন