
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশজুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আজ একযোগে তিনটি জেলায় পরিচালনা করেছে এনফোর্সমেন্ট অভিযান।

সড়ক নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নয়ন প্রকল্প—তিন খাতে পৃথক অভিযানে উঠে এসেছে নিম্নমানের কাজ, অব্যবস্থাপনা এবং অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ। মাঠপর্যায়ের সরেজমিন অনুসন্ধানে অনিয়মের বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করেছে দুদক টিম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিম্নমানের সড়ক নির্মাণ : জনগণের ক্ষোভ, নমুনা সংগ্রহ : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলায় সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারসহ নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, কুমিল্লা হতে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযান পরিচালনা কালে টিম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুইজন নিরপেক্ষ প্রকৌশলী; স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দুইজন প্রকৌশলী; সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় জনসাধারণের উপস্থিতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর হতে শাহজাদাপুর চকবাজার অংশ পর্যন্ত সড়ক সরেজমিনে পরিদর্শন করে।

পরিদর্শনকালে উপস্থিত জনসাধারণ সড়কের মান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। টিম সড়কের ভিন্ন ভিন্ন তিনটি স্থান থেকে নির্মাণসামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে। সংগৃহীত নমুনার বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে কমিশন বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ—নতুন সড়ক নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই ফাটল ও ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট, যা সরকারি অর্থের অপচয়ের ভয়াবহ ইঙ্গিত বহন করে।
সিরাজগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবায় চরম অব্যবস্থাপনা : ডাক্তার বাদ দিয়ে নার্সের ব্যবস্থাপত্র ! সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা প্রদানে হয়রানি ও নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পাবনা হতে আরেকটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান পরিচালনা কালে দুদক টিম ছদ্মবেশে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এবং হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ও স্টাফদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। প্রাপ্ত তথ্য ও উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—বিধি বহির্ভূতভাবে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) ও সিনিয়র স্টাফ নার্স কর্তৃক জরুরি ও বহির্বিভাগের রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হচ্ছে।
রোগীরা অভিযোগ করেন—হাসপাতালের প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত সকল ওষুধ সরবরাহ করা হয় না; বরং অধিকাংশ ওষুধ বাহির থেকে কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া প্যাথোলজিক্যাল ইউনিট ও ওয়ার্ডের পরিবেশ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পাওয়া যায়।
এনফোর্সমেন্ট টিমের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়—চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থায় ব্যাপক অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। এ বিষয়ে কমিশন বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য—“সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যের চিকিৎসা কাগজে-কলমে, বাস্তবে রোগীরা বাধ্য হচ্ছেন বাইরে খরচ করতে।”
ঠাকুরগাঁওয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ: রাস্তায় তদন্ত, নথি জব্দ : ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে টি.আর ও কাবিখা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঠাকুরগাঁও থেকে পৃথক এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান পরিচালনা কালে টিম পীরগঞ্জ উপজেলার ২০২২-২৩ অর্থবছরের টি.আর ও কাবিখা প্রকল্পের আওতাধীন রাস্তাসমূহ পরিদর্শন করে। এ সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনাপূর্বক কমিশন বরাবর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
স্থানীয় অভিযোগ—কাগজে রাস্তা নির্মাণ হলেও বাস্তবে কাজের মান প্রশ্নবিদ্ধ, কোথাও আবার আংশিক কাজ দেখিয়ে সম্পূর্ণ বিল উত্তোলনের ইঙ্গিত মিলেছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের কঠোর বার্তা : একই দিনে তিন জেলায় পরিচালিত অভিযানে স্পষ্ট হয়েছে—সড়ক নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নয়ন প্রকল্প—রাষ্ট্রীয় সেবার গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার শেকড় কতটা গভীরে বিস্তৃত। তবে দুদকের সক্রিয় মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি প্রমাণ করে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র এখন আর নীরব নয়। দুদক সূত্র জানিয়েছে, সংগৃহীত নমুনা, নথিপত্র ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বার্তা স্পষ্ট : সরকারি অর্থ লুটপাট, নিম্নমানের কাজ কিংবা স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলা—কোনো অনিয়মই আর আড়ালে থাকবে না। দুদকের অভিযান চলবে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।*
