
নিজস্ব প্রতিবেদক : সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংযুক্ত সহকারী পরিচালক আব্দুর রশীদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগে প্রশাসনিক অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে—তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী নিয়োগ সিন্ডিকেট পরিচালনা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

অভিযোগের সারসংক্ষেপ : অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে আব্দুর রশীদ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বগুড়ায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিকানা রয়েছে তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে—যা তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, তার ও পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান করলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যেতে পারে।

“কিং অব নিয়োগ সিন্ডিকেট” উপাধি :: সমাজসেবা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে তাকে “কিং অব নিয়োগ সিন্ডিকেট” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে প্রশাসন-২ শাখায় সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।

অফিস সহকারী, অফিস সহায়ক, গাড়িচালক, ফিল্ড সুপারভাইজার, সহকারী হিসাবরক্ষক ও বাবুর্চি পদসহ বিভিন্ন নিয়োগে তিনি বরাবরই নিয়োগ কমিটির সদস্য ছিলেন।
অভিযোগ উঠেছে—পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়া, বোরকা পরে ভিন্ন ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায়।
তিনস্তর বিশিষ্ট নিয়োগ নেটওয়ার্ক : সূত্র জানায়, আব্দুর রশীদের নিয়োগ সিন্ডিকেট ছিল তিন ধাপে সংগঠিত— প্রার্থী সংগ্রহ ধাপ: সারা দেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের সংগ্রহ করা হতো।
চুক্তি ও কোড সিগনাল: নির্ধারিত অঙ্কে চুক্তি সম্পন্ন হলে একটি কোডের মাধ্যমে তাকে নিশ্চিত করা হতো। পরীক্ষা কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ: তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সহযোগীদের মাধ্যমে পরীক্ষা কেন্দ্র থেকেই মূল কারসাজি শুরু হতো। উচ্চমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর সেলিমের সহায়তায় ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে।
২০১৯ সালের পরীক্ষা স্থগিত—কারণ প্রশ্নপত্র ফাঁস ? ২০১৯ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কয়েকটি ক্যাটাগরিতে প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ফার্মেসি বিভাগকে। ওই সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে এবং তৎকালীন মহাপরিচালক গাজী নুরুল কবির লিখিত পরীক্ষা স্থগিত করেন।
এতে বিপাকে পড়েন লক্ষাধিক পরীক্ষার্থী। তবে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—এত বড় অনিয়মের পরও কীভাবে আব্দুর রশীদ স্বপদে বহাল থাকলেন?
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও ‘দলবদল’ অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে নতুন করে তদবির বাণিজ্য শুরু করার চেষ্টা করছেন। অতীতে আওয়ামীপন্থী সুবিধাভোগী হলেও বর্তমানে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ : অভিযোগে আরও বলা হয়, অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ে তার আত্মীয়-স্বজন কর্মরত। তার ভাই মো. ওবায়দুর রহমান জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে কর্মরত এবং প্রধান কার্যালয়ে ভাতিজা বুলবুল (ড্রাইভার)সহ আরও কয়েকজন আত্মীয় রয়েছেন। ফলে অভ্যন্তরীণভাবে “আব্দুর রশীদ এন্ড ফ্যামিলি দপ্তর” নামে কটাক্ষও প্রচলিত হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
দুদকে গণস্বাক্ষরিত অভিযোগ : গত ৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন-এ গণস্বাক্ষরিত অভিযোগ জমা পড়ে। সেখানে ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগ বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে অভিযোগের অগ্রগতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
প্রায় ২৫ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ : সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিগত কয়েক বছরে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রায় ২৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। বর্তমানে তিনি সমাজসেবা অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক পদে আসীন হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনিক তদন্তের দাবি : এমন বিস্ফোরক অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মহল নিরপেক্ষ তদন্ত ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুর রশীদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযুক্ত করা হবে।
