প্রশাসনে ঝড়ের আগমনী বার্তা  : এক সপ্তাহেই রদবদলের ভূমিকম্প  !  

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহ না পেরোতেই প্রশাসনে বইতে শুরু করেছে অদৃশ্য ঝড়। ক্ষমতার করিডোরে এখন ফিসফাস, দৌড়ঝাঁপ আর তৎপরতার তীব্র গুঞ্জন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের আভাস স্পষ্ট। সচিবালয়ের ভেতরে চলছে হিসাব-নিকাশ, কে থাকবেন, কে যাবেন—সেই উত্তেজনায় টানটান অবস্থা।


বিজ্ঞাপন

মুখ্য সচিব নিয়োগে বার্তা স্পষ্ট  :  প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পদে সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী এ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ দেখা গেছে—প্রেস সচিব থেকে একান্ত সচিব, প্রোটোকল অফিসার—সবখানেই পুনর্বিন্যাসের ছাপ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল রুটিন বদলি, নাকি প্রশাসনে গভীর শুদ্ধি অভিযানের সূচনা?


বিজ্ঞাপন

চুক্তিভিত্তিক সচিবদের ‘বদলি আতঙ্ক’ না কি তদন্তের ভয় ?
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া অন্তত ১১ জন সচিব দায়িত্বে আছেন। জনপ্রশাসন সূত্র বলছে, গত ১৮ মাসে এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ জমেছে। কেউ কেউ সরাসরি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত।


বিজ্ঞাপন

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব শেখ আবদুর রশিদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার চুক্তি বাতিল—সরকারি ভাষায় ‘আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে’ হলেও, রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন অন্যখানে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ—ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছিল। এরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে শূন্যতা :  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব পদসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো শূন্য। আজ রোববার না হলে চলতি সপ্তাহেই বড় রদবদল আসছে—এমনটাই বলছে একাধিক সূত্র। মাঠ প্রশাসনের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পর্যায়েও বদল আসতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ইতিমধ্যেই বদলির তালিকায় ঘুরছে বলে জানা গেছে।

‘দলীয়করণ’ নিয়ে সতর্কবার্তা  :  ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। চতুর্থবারের মতো সরকারে বিএনপি, আর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু ইতিহাস বলছে—প্রতিবার সরকার বদল মানেই প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ আর দলীয়করণ দেখতে চায় না। অতীতে যে দল এসেছে, প্রশাসন-পুলিশ-রাষ্ট্রীয় সংস্থায় নিজেদের লোক বসিয়েছে—এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের তৎপরতা বেড়েছে—এমন অভিযোগও উঠছে। দুই দশক ধরে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ তুলে তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন—মেধা ও সততা কি সত্যিই একমাত্র মানদণ্ড হবে?

স্থানীয় সরকার বিভাগে বিস্ফোরক অভিযোগ : স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ। নির্বাচন তফসিল ঘোষণার পর আইন অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও, কমিশনের নির্দেশ উপেক্ষা করে পদোন্নতি ও পদায়নের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগে অনিয়ম, উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে দুর্নীতি—এসব নিয়ে দুদক তদন্ত করছে। ঘুষ, টেন্ডার বাণিজ্য, ব্ল্যাকমেইলিং—অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলছেন, এসবের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফিরবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ‘ওএসডি ঝড়’ : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রথম ছয় মাসেই ১৪ জন সিনিয়র সচিব ও সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, ২৩ জনকে ওএসডি করা হয়। অতিরিক্ত সচিব পর্যায়েও ব্যাপক রদবদল হয়। এখন সেই সিদ্ধান্তগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি উল্টো পথে হাঁটবে নতুন সরকার—তা নিয়ে চলছে জল্পনা।

মেরিটোক্রেসির প্রতিশ্রুতি—বাস্তবায়ন হবে ?  বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে—মেধা, সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই হবে নিয়োগ ও পদোন্নতির একমাত্র মানদণ্ড। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল মিঞা বলেছেন, আগে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হবে, আর যোগ্য অথচ বঞ্চিত কর্মকর্তাদের যথাযথ পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সামনে কী ? প্রশাসনে এখন এক অদৃশ্য কাউন্টডাউন চলছে। আজ না হলে এই সপ্তাহেই আসতে পারে বড়সড় রদবদল। কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক সচিবের বিদায় প্রায় নিশ্চিত—এমন গুঞ্জন ছড়িয়েছে সচিবালয়ে। মাঠ প্রশাসনেও বদলের ঢেউ লাগতে পারে।

প্রশ্ন একটাই—এটি কি হবে সত্যিকারের শুদ্ধি অভিযান, নাকি নতুন করে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ? দেশ তাকিয়ে আছে—প্রশাসনে কি সত্যিই মেধা ও সততার জয় হবে, নাকি পুরোনো চক্রের জায়গায় বসবে নতুন চক্র? সময়ই দেবে সেই উত্তর।

👁️ 54 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *