বিআরটিএ-র খিলক্ষেত সার্কেলে লাইসেন্স বাণিজ্যের অভিযোগ : ফিল্ড টেস্টে ‘ফেল-পাস’ নিয়ন্ত্রণ, মাসে কোটি টাকার ঘুষ—তদন্তের দাবি

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা মহানগরীর খিলক্ষেত সার্কেলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্যক্রমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ফিল্ড টেস্টে ‘ফেল-পাস নিয়ন্ত্রণ’কে কেন্দ্র করে একটি সংগঠিত চক্র সক্রিয়—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক লাইসেন্সপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন খিলক্ষেত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকারী এক কর্মকর্তা, যিনি স্থানীয়ভাবে “এফ-পি’র হোতা” (ফেল-পাস নিয়ন্ত্রণকারী) হিসেবে পরিচিত বলে দাবি আবেদনকারীদের।

অভিযোগের সারসংক্ষেপ :  সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি— ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফিল্ড টেস্টে পাস বা ফেল নির্ধারণে অনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়। নির্দিষ্ট অঙ্ক পরিশোধ করলে পাস নিশ্চিত করা হয়—অন্যথায় অকারণে ফেল দেখানো হয়। একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। প্রতি মাসে প্রায় দুই কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫–২০২৬ সালের শুরুর ১৪ মাসে প্রায় ৫০ কোটি ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতানোর অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

ঢাকা, কক্সবাজার ও দোহার (ঢাকা) এলাকায় নামে-বেনামে বাড়ি ও জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগগুলোর স্বতন্ত্র যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি। তবে একাধিক সাক্ষ্য ও নথির দাবি সামনে আসায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

কর্মজীবনের পটভূমি ও পদোন্নতির প্রশ্ন : অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিএনপি আমলে মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। গত ২৪ মার্চ ২০২০ তারিখে তিনি মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন।

পরবর্তীতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান-এর সুপারিশে সহকারী পরিচালক (এডি) পদে পদোন্নতি পান এবং ঢাকা মেট্রো-১ (খিলক্ষেত সার্কেল)-এ নিয়োগ পান—এমন অভিযোগ রয়েছে। পদোন্নতির প্রক্রিয়া ও সুপারিশের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা।

ফিল্ড টেস্টে অনিয়মের অভিযোগ  :  লাইসেন্সপ্রার্থীদের একাংশের অভিযোগ, ফিল্ড টেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল দেখানো হয়। পরে দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে পরবর্তী পরীক্ষায় পাস নিশ্চিত করা হয়।

এক আবেদনকারী বলেন, “পরীক্ষা ভালো দেওয়ার পরও ফেল দেখানো হয়। পরে দালাল যোগাযোগ করে বলে—নির্দিষ্ট টাকা দিলে পরেরবার সমস্যা হবে না।”

আরেকজন দাবি করেন, “অফিসের বাইরে নির্দিষ্ট কিছু লোক সব প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। টাকা ছাড়া কাজ হয় না—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে।” এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলে তা পাওয়া যায়নি।

সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ঢাকা, কক্সবাজার ও নিজ গ্রাম দোহার এলাকায় উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়েছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি মাসিক আয় সরকারি বেতনের সীমার মধ্যে থাকে, তবে হঠাৎ বিপুল সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি।

দুর্নীতি দমন সংশ্লিষ্ট এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হলে সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, ভূমি রেজিস্ট্রি রেকর্ড—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনা উচিত।”

প্রশাসনিক জবাবদিহি ও জনস্বার্থ :  বিআরটিএ দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম হলে তা শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়—সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্ত, সম্পদ বিবরণী যাচাই এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিক্রিয়া : এই প্রতিবেদনের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। লিখিত বক্তব্য পাওয়া গেলে তা হুবহু প্রকাশ করা হবে।

উপসংহার : খিলক্ষেত সার্কেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্যক্রমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো জনস্বার্থে গুরুত্বের দাবি রাখে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করার শামিল। স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে।

👁️ 66 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *