
বিশেষ প্রতিবেদক : ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কথিত ‘মাফিয়া নেটওয়ার্ক’ এখনো সক্রিয়—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী ও ই/এম বিভাগ-৮ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেবকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট, ভুয়া বিল এবং অবৈধ সম্পদের ভয়ংকর সব তথ্য।

অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট এখনো গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সেই প্রভাব খাটিয়েই চলছে শত কোটি টাকার লুটপাট।
ঢাকায় পোস্টিং পেতে ১০ কোটি টাকার তদবির ! অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরী ঢাকায় “লাভজনক” পোস্টিং নিশ্চিত করতে অন্তত ১০ কোটি টাকার তদবির ও ঘুষ বাণিজ্য পরিচালনা করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টিপু মুন্সির প্রত্যক্ষ প্রভাবেই তিনি ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল–২-এ নিজের পোস্টিং নিশ্চিত করেন। এর আগে গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। বরং পুরোনো সেই রাজনৈতিক বলয় ব্যবহার করেই তিনি আবারও প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরে এসেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বগুড়ায় ওটিএম কেলেঙ্কারি: এলটিএম এড়িয়ে কমিশন বাণিজ্য : বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে এলটিএম পদ্ধতি এড়িয়ে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ ও এপিপিভুক্ত কাজগুলোতে ওটিএম অনুমোদনের আড়ালে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য চালানো হয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে উল্লেখিত ওটিএম টেন্ডার আইডিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ১১১১৭৮১, ১১১৯৩১৬, ১১১৩০৭৯, ১১১১৫৬৩, ১১১১৫৫৮, ১১১১৫৫৯, ১১১১৫৬০, ১১১১৫৭০, ১১১১৫৬৭, ১১১১৫৬৯, ১১১১৫৬১, ১১১১৫৬৪, ১১১১৫৬৫, ১১১১৫৬৬, ১০৮১৫৪৬, ১১০০৭৯০, ১১০২০২৮, ১০৯১৯৭৩, ১০৯১৯৭৪, ১০৯১৯৭৫, ১০৯১৯৭৬, ১০৯১৯৭৭, ১০৯১৯৭৮, ১০৯১৯৭৯, ১০৮২১৫৯, ১০৮০২৩৫, ১০৮০২৩৬, ১০৬৯১৩১, ১০৭০৮৭৪, ১০৭০৮৭৫, ১০৭০৮৭৬, ১০৭১২৬৫, ১০৪৩২৪৮, ১০২৯৫৯৬ ও ১০১৮১৫৯।

ভেরিয়েশন বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা লোপাট : শুধু টেন্ডার নয়, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে “ভেরিয়েশন” সুবিধা দেখিয়েও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করা হতো নিয়মিতভাবে।
সপ্তাহে দুই দিন অফিস, বাকি সময় পোস্টিং তদবির : অভিযোগ রয়েছে, বগুড়া সার্কেলে দায়িত্বে থাকলেও সপ্তাহে মাত্র দুই দিন অফিস করতেন আবু নাসের চৌধুরী। বাকি সময় কাটাতেন ঢাকায়—ওয়াকিং সার্কেল এবং পরবর্তীতে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল–২-এ পোস্টিং নিশ্চিত করার তদবিরে। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তার অনিয়মিত উপস্থিতির বাস্তব চিত্র বেরিয়ে আসবে।
ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যাংক ব্যালেন্সের পাহাড় : আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী তার সম্পদের তালিকায় রয়েছে— বসুন্ধারা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে আরেকটি ফ্ল্যাট, বারিধারা ও গুলশান–২ এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, গাজীপুরে প্রায় ২০ একর জমি, Uttara Bank PLC-এ বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা এসব সম্পদের বৈধ উৎস কী—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
টিপু মুন্সির ছায়ায় ‘অপ্রতিরোধ্য’ দাপট : গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী টিপু মুন্সির ভায়রা হওয়ার সুবাদেই আওয়ামী আমলে কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন আবু নাসের চৌধুরী।
তার বিরুদ্ধে কথা বললেই বদলি, হয়রানি কিংবা পদোন্নতি আটকে দেওয়ার ভয় কাজ করত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
বর্তমানেও সেই পুরোনো “ফ্যাসিবাদী আচরণ” ফিরে আসছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণপূর্তের অনেকে।
বিসিএস ছাড়াই ‘ক্যাডার’ পরিচয়!
নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তালেবের বিরুদ্ধে ভয়ংকর জালিয়াতির অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৮ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেবের বিরুদ্ধে উঠেছে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কোনো বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও রাজনৈতিক প্রভাবে অবৈধভাবে ক্যাডার পদে নিয়োগ পান এবং পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা অর্জন করে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি নেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন নন-ক্যাডারের এভাবে ক্যাডার পরিচয়ে পদোন্নতি পাওয়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।
কাজ না করেই ৫ কোটি টাকার বিল উত্তোলন : অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে অন্তত ১৬টি উন্নয়ন ও মেরামত প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই ৫ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে আবু তালেবের বিরুদ্ধে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ৫৬.৩ লাখ টাকা এবং ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে ৩৬.১২ লাখ টাকা, সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নথিতে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো সংস্কার কাজই হয়নি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ আরও ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মেরামত কাজের সম্পূর্ণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

ভুয়া প্রত্যয়নপত্রে বিল উত্তোলন : অভিযোগ রয়েছে, কাজ সম্পন্ন হয়েছে—এমন মর্মে ব্যাকডেটেড ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি করে নথিতে সংযুক্ত করা হয়েছে। সরকারি ক্রয় আইন ও দণ্ডবিধি লঙ্ঘন করে এই জালিয়াতির মাধ্যমে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও “ম্যানেজ” করে এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করা হতো।
কমিশন ছাড়া কাজ নয় ! গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৮ এ আবু তালেব গড়ে তুলেছেন কথিত “কমিশন রাজ”—এমন অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই ১০ শতাংশ নগদ কমিশন নিশ্চিত করতে হতো।
তার নিজস্ব সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো ঠিকাদারের পক্ষে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, আবু তালেবের দুর্নীতির কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা কাজ হারিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
অবৈধ সম্পদের পাহাড় : অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির আয়ের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন আবু তালেব। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ঢাকা ও আশপাশে তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা কাজ শুরু করেছে বলেও জানা গেছে।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু : আবু তালেবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে নথিপত্র যাচাই শুরু করেছে। অভিযোগকারী আমিনুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে জরুরি তদন্ত, সাময়িক বরখাস্ত এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত আবু তালেবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণপূর্তে দুর্নীতির ‘ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেট’ কি এখনো বহাল ?
গণপূর্ত অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরেই টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আলোচিত।
বিশেষ করে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বিভাগে অনিয়ম আরও প্রকট বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, “সমঝোতা” ছাড়া কোনো কাজ পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই কমিশনের হার নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়—দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা, সম্পদ জব্দ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ই-টেন্ডারিং, থার্ড পার্টি মনিটরিং ও ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন জোরদার করা প্রয়োজন।
দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরে যদি এমন দুর্নীতি চলতে থাকে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ব্যবস্থা—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।
