প্রশ্নফাঁস, ডামি পরীক্ষার্থী ও কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য ! বিআইডব্লিউটিএতে ‘আওয়ামী দোসর’ সিন্ডিকেটের দাপট, নিয়োগ কমিটির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস, ডামি পরীক্ষার্থী এবং কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে।

সূত্রমতে, গত ১৬ মে রাজধানীর মিরপুরের বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বালক ও বালিকা শাখা) এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলা ওই পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীদের দাবি,  নিয়োগ সিন্ডিকেট তাদের মনোনীত প্রার্থীদের হাতে আগেভাগেই প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে দেয়। এমনকি দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটেই প্রশ্নের উত্তরপত্র গণমাধ্যমের হাতে পৌঁছে যায়। এরপর পুরো পরীক্ষাকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে চাকরি দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ ১৯৯০ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী এসব চতুর্থ শ্রেণির পদে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লিখিত পরীক্ষার নামে সাজানো নিয়োগ নাটক পরিচালনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি-০৩/২০২৫ অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএতে ২১ জন লস্কর, ১ জন বাস হেলপার, ২৩ জন শুল্ক প্রহরী, ৬ জন মার্কম্যান, ১৩ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী এবং ২ জন ড্রাইভার নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ গেজেট অতিরিক্ত, নভেম্বর-৮ (১৯৯০) অনুযায়ী এমএলএম, গার্ড, নৈশ্যপ্রহরী, শুল্কপ্রহরী, মালি, ঝাড়ুদার, ক্লিনার, হেলপারসহ বিভিন্ন চতুর্থ শ্রেণির পদে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী প্রার্থী নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই বিধি উপেক্ষা করে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে দুর্নীতিবাজ চক্র নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে।

ডামি পরীক্ষার্থী” দিয়ে পাস করানো হয় !  বিআইডব্লিউটিএ’র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুরো নিয়োগ জালিয়াতি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এরপর মূল পরীক্ষার্থীর বদলে “ডামি” বা “বডি চেঞ্জ” পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়।

লিখিত পরীক্ষায় পাসের পর একইভাবে প্রাকটিক্যাল ও ভাইভাতেও প্রক্সি পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চুক্তির ৩০ শতাংশ, প্রাকটিক্যাল শেষে আরও ৩০ শতাংশ এবং চূড়ান্ত ভাইভা শেষে বাকি ৪০ শতাংশ টাকা লেনদেন হয়। পরে সেই অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নেয় সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পরীক্ষার্থীদের ছবি ও স্বাক্ষর যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। হাজিরা শিট ও উত্তরপত্রের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখা হয়নি। ফলে ভুয়া পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এমনকি পরীক্ষার হলে মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে।

আওয়ামী দোসরদের সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় ! অভিযোগে উঠে এসেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র সাবেক শ্রমিক লীগ নেতা আকতার ও ছরোয়ারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী-এর প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন জেলার শত শত লোককে চাকরি দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, আওয়ামী আমলে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট এখনও অপ্রতিরোধ্য। ফলে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন আর টাকার বিনিময়ে অযোগ্যরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করছেন।

নিয়োগ কমিটির বিরুদ্ধে সরাসরি নিয়োগের অভিযোগ :
এই নিয়োগ পরীক্ষার আহ্বায়ক ছিলেন মোঃ সাজেদুর রহমান, যুগ্ম সচিব ও সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন)। সদস্য সচিব ছিলেন মোঃ কবির হোসেন, অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ)। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গোপাল বাবু (পরিচালক, হিসাব), মোঃ গোলাম ফারুক (নিরীক্ষা) এবং মোঃ মিজানুর রহমান (যুগ্ম পরিচালক, প্রশাসন ও মানবসম্পদ)।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ : নিয়োগ কমিটির ছত্রচ্ছায়াতেই পুরো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে আহ্বায়ক মোঃ সাজেদুর রহমান দাবি করেন, পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব ছিল মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটির এবং খাতা মূল্যায়নও তারাই করেছে। তার ভাষ্য, “প্রশ্নফাঁসের সুযোগ নেই।” তবে মৌখিক পরীক্ষার বিধান থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমেই নিয়োগ নেওয়া হয়।”

“একই হাতের লেখায় একাধিক খাতা”—তদন্তের দাবি :
ভুক্তভোগীরা দাবি জানিয়েছেন—একই হাতের লেখায় একাধিক উত্তরপত্র আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে, হাজিরা শিট ও উত্তরপত্রের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখতে হবে, টপশিটে দেওয়া তথ্য ও স্বাক্ষরের সঙ্গে পরীক্ষার্থীর প্রকৃত তথ্য মিলছে কি না তা যাচাই করতে হবে, নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে কারা পরীক্ষা দিয়েছে তা তদন্ত করতে হবে এবং পরীক্ষার হলে মোবাইল ব্যবহারের বিষয় অনুসন্ধান করতে হবে তাদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্ত হলে পুরো নিয়োগ সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচিত হবে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিআইডব্লিউটিএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি নিয়োগেই এমন ভয়াবহ দুর্নীতি হয়, তবে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও তাদের পরিবার নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

👁️ 86 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *