শ্রীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়মের অভিযোগ : অবৈধ সম্পদ, দায়িত্বে গাফিলতি ও নারী নিগ্রহের অভিযোগে আলোচনায় টিএইচও ডা. আশরাফুজ্জামান লিটন

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত খুলনা গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ স্বাস্থ্য

শ্রীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এর দায়িত্ব প্রাপ্ত ডাক্তার টিএইচও ডা. আশরাফুজ্জামান লিটন।মাগুরা প্রতিনিধি  : মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. মো. আশরাফুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সরকারি দায়িত্বে অবহেলা, বেসরকারি ক্লিনিকে অতিরিক্ত সময় ব্যয়, নারী নিগ্রহ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা খাত ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ডা. লিটন অধিকাংশ সময় বেসরকারি ক্লিনিকে অপারেশন ও ব্যক্তিগত চিকিৎসা কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকেন। ফলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন।

স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে তার অনিয়ম দীর্ঘদিনের এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


বিজ্ঞাপন

একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারি হাসপাতালে অপারেশন বা বিশেষ চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও রোগীদের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের কারণে অতীতে জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকেও তাকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

পাঁচ কোটি টাকার বহুতল ভবন নিয়ে প্রশ্ন  :  অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ডা. লিটনের নামে বা তার নিয়ন্ত্রণে মাগুরা শহরে প্রায় ১০ তলা বিশিষ্ট একটি বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এই বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের মতে, তার সম্পদ বৃদ্ধির উৎস, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

নারী নিগ্রহের অভিযোগে তোলপাড়  :  ডা. লিটনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি ক্লিনিকে কর্মরত নারী নার্স ও আয়াদের প্রতি অসদাচরণ এবং যৌন হয়রানির অভিযোগ।

একাধিক সূত্র দাবি করেছে, তিনি বিভিন্ন ক্লিনিকে অপারেশনের সময় বা পেশাগত সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে নারী কর্মীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করতেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

বদলি ঠেকাতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ  :  অভিযোগ রয়েছে, গত প্রায় চার বছর ধরে তিনি মাগুরা স্বাস্থ্য বিভাগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অবস্থান করছেন। এ সময়ে একাধিকবার বদলির আদেশ জারি হলেও নানা প্রভাব খাটিয়ে তা বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থান করছেন, যা সরকারি চাকরির স্বাভাবিক রদবদল প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

গাংনীতে কর্মরত অবস্থায়ও ছিল বিতর্ক  : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।

পরবর্তীতে তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তবে সেই সময়ের অভিযোগগুলোরও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

গ্রাম ডাক্তার প্রশিক্ষণে ৮০ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ২০২৩ সালে পরিচালিত একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাগুরা জেলার চারটি উপজেলার প্রায় এক হাজার গ্রাম ডাক্তারকে “প্রাইমারি হেলথ কেয়ার” শীর্ষক ১ মাস ২১ দিনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ শেষে সনদপত্র বিতরণের সময় অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮ হাজার ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়। এতে প্রায় ৮০ লাখ টাকার একটি আর্থিক লেনদেন সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন ডা. আশরাফুজ্জামান লিটন।

তবে এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, আদায়ের বৈধতা কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।

তদন্তের দাবি :  স্বাস্থ্যসেবার মতো স্পর্শকাতর খাতে দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে এতগুলো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল মনে করছে, সরকারি দায়িত্বে অবহেলা, অবৈধ সম্পদ অর্জন, নারী নিগ্রহ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডা. মো. আশরাফুজ্জামান লিটনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

উল্লেখ্য, উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের দাবি ও বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

👁️ 38 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *