!! ফলোআপ !! বদলি হলেই রাজনৈতিক তদবীর !! এক যুগ ধরে খুলনা গণপূর্তে অদৃশ্য শক্তির ছায়া আওয়ামী ঠিকাদার : শওকত–প্রকৌশলী সাইফুল সিন্ডিকেটে উন্নয়নের নামে সর্বনাশ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত খুলনা জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি (খুলনা) :  খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ যেন একটি ব্যক্তিগত জমিদারিতে পরিণত হয়েছে। বদলির আদেশ এলেই তা বাতিল, আর বাতিলের পেছনে চলে কোটি টাকার প্রকল্প, রাজনৈতিক তদবীর ও অদৃশ্য ক্ষমতার দাপট। এই অদৃশ্য শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম—যিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে বহাল থেকে দুর্নীতির এক অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।


বিজ্ঞাপন

১২ বছর একই চেয়ারে—প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে কীভাবে ?
২০১৪ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদানের পর থেকেই খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ অবস্থান করছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম। নিয়ম অনুযায়ী যেখানে তিন বছর পরপর বদলি বাধ্যতামূলক, সেখানে তিনি ২০১৪ থেকে ২০২৬—টানা ১২ বছরের বেশি সময় একই দপ্তরে বহাল। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যদের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি এই অস্বাভাবিক অবস্থান নিশ্চিত করেছেন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল ও খুলনা মহানগর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজনের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে খুলনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের উপর ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতেন সাইফুল ইসলাম। ফলে পুরো দপ্তর কার্যত তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।


বিজ্ঞাপন

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: কোটি টাকার বরাদ্দ, বেহাল দশা : দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অথচ বাস্তব চিত্র ভয়াবহ—জরাজীর্ণ ভবন, নষ্ট ওয়াশরুম, ভাঙাচোরা ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এডিপি), স্বাস্থ্য খাতের বিশেষ বরাদ্দ ও বিশ্বব্যাংকের অনুদান থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কাজের কোনো প্রতিফলন নেই।


বিজ্ঞাপন

গত কয়েক বছরের টেন্ডার শিডিউল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একই কাজ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বারবার দেখানো হয়েছে, অথচ মাঠপর্যায়ে কাজের অস্তিত্ব নেই। অভিযোগ রয়েছে—ভুয়া বিল, নকশাবহির্ভূত এস্টিমেট ও মেজারমেন্ট বুক এন্ট্রি ছাড়াই বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার মূল কারিগর ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম।

অডিটে ধরা পড়ল ৪৪ লাখ টাকার আত্মসাৎ : বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ‘কোভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া ও মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্প’-এর আওতায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ শয্যার ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও ৫ শয্যার প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউ স্থাপন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (এফএপিএডি) অডিট টিম মাঠপর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করে ৪৪ লাখ ১০ হাজার ৫১ টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পায়। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট অফিসার কৈলেশ চন্দ্র দাস স্বাক্ষরিত তিনটি আপত্তিপত্রে এ তথ্য উঠে আসে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এন বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী জানান, নকশাবহির্ভূত ও গোঁজামিল দেওয়া এস্টিমেট নিয়ে প্রশ্ন তুললে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম তাকে ‘বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করার’ নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে যেটুকু কাজ দেখানো হয়েছে, শুধু সেটুকুই করতে বাধ্য হন তারা।

বদলির আদেশ এলেই তদবীর—লাগে লাখ লাখ টাকা !
নভেম্বর ২০২০ সালে সাইফুল ইসলামকে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হলেও মাত্র দুই মাসের মাথায় শেখ সোহেল ও শেখ সুজনের সরাসরি হস্তক্ষেপে অবৈধ অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে আবার খুলনায় ফিরে আসেন।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর—এই চার মাসে তিন দফা বদলি ও বাতিল নাটকের পেছনে তার ৩০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে তিনি নিজেই ঘনিষ্ঠ মহলে স্বীকার করেছেন।

নতুন রূপে পুরনো সিন্ডিকেট :  ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও সিন্ডিকেট ভাঙেনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ সুজনের সাবেক ম্যানেজার ঠিকাদার শওকতকে সামনে রেখে এখন বিএনপি নেতা লাভু বিশ্বাসের ছত্রছায়ায় খুলনা গণপূর্তে একই লুটপাট অব্যাহত রেখেছেন সাইফুল ইসলাম।

খুলনাবাসীর প্রশ্ন : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলেও কিভাবে একজন বিতর্কিত ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এক যুগের বেশি সময় একই দপ্তরে বহাল থাকেন? কোটি কোটি টাকার প্রকল্প, বিশ্বব্যাংকের অর্থ, স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ—সবই কি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি?

খুলনাবাসী এখন স্পষ্টভাবে দাবি তুলেছেন— গণপূর্ত উপদেষ্টা, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর জরুরি হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি দমন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অবিলম্বে সাইফুল ইসলাম ও তার সিন্ডিকেটকে খুলনা থেকে অপসারণ, নচেৎ খুলনা গণপূর্ত বিভাগ উন্নয়নের নয়, দুর্নীতির প্রতীক হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।

👁️ 132 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *