
নিজস্ব প্রতিনিধি, (বেনাপোল) : দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোলে চোরাচালান, সিন্ডিকেট বাণিজ্য ও কথিত চাঁদাবাজির নেপথ্যে উঠে এসেছে এক আলোচিত নাম— কামাল হোসেন। এক সময়ের মোবাইল রিচার্জ ব্যবসায়ী ও কুরিয়ার অফিসের সাধারণ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কীভাবে অল্প সময়েই শতকোটি টাকার মালিক বনে গেলেন— তা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায় : কর্মজীবনের শুরুতে কামাল বেনাপোল বাজারে একটি মোবাইলের ছোট দোকান পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে তিনি কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসের বেনাপোল অফিসের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে চোরাচালান পণ্যের বুকিং ও পারাপারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
স্থানীয়দের দাবি : কুরিয়ার ব্যবসার আড়ালে অবৈধ পণ্য পরিবহন ও সিন্ডিকেট বাণিজ্য থেকে তার উত্থান শুরু। পরবর্তীতে প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে তিনি সাংবাদিকতাকে ‘ঢাল’ হিসেবে বেছে নেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনের বেনাপোল প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত হন।

সাংবাদিকতার পরিচয়ে ‘অপ্রত্যাশিত সম্পদের পাহাড়’ : স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বেনাপোল দিঘীরপাড় এলাকায় বহুতল বিলাসবহুল বাড়ি, কাগজপুকুর এলাকায় আধুনিক মার্কেট, যশোর শহরে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি— এসব সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী।

একাধিক সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেনাপোল বন্দরে কিছু সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে কাস্টমস ও বন্দরের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
তাদের দাবি, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বাধা দিলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া হয়। কামাল হোসেন এই চক্রের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ভুয়া সনদের অভিযোগ : অনুসন্ধানে জানা যায়, কামাল এইচএসসি পাস হলেও সাংবাদিকতার চাকরি পেতে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর সনদ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি একটি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ কোর্সে অধ্যয়নরত বলে জানা গেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ তদন্তের দাবি উঠেছে।
চোরাচালান ও অর্থপাচারের অভিযোগ : সূত্র জানায়, কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার পরিচালনার সময় চোরাচালানি পণ্য পরিবহনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার তথ্য রয়েছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকার কিছু চিহ্নিত অপরাধচক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টম হাউসে একটি পার্টসের চালান আটক হওয়ার পর সেটি ছাড় করাতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
স্থানীয়দের দাবি— তদন্ত হোক : দিঘীরপাড় ও বেনাপোল এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি— এক সময়ের বেকার যুবক কীভাবে অল্প সময়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তা খতিয়ে দেখতে দুদক ও সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি : এ বিষয়ে কামাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উপসংহার : বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার। সেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সিন্ডিকেট ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করলে তা জাতীয় রাজস্ব ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সময়ের দাবি।
