
নিজস্ব প্রতিবেদক : নির্বাচন এলেই রাষ্ট্রের ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক কাজ করে—কালোটাকা, অবৈধ লেনদেন আর ক্ষমতার অপব্যবহার। সেই আতঙ্ক থেকেই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে এক কঠোর সিদ্ধান্ত। কালোটাকা ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ ঠেকাতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে ৯৬ ঘণ্টার জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভালো। রাষ্ট্রের সাহসী উদ্যোগ হিসেবে এটি প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কঠোরতার মাশুল দিচ্ছে কারা?

গত রবিবার ৮ ফেব্রুয়ারী, রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত বিকাশ, নগদ, রকেটসহ এমএফএসে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন সীমিত করা হয়েছে। একবারে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা, দিনে দশ হাজার টাকার বেশি পাঠানো যাবে না। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও ব্যাংক অ্যাপের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি টাকা পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ। কাগজে-কলমে এই সিদ্ধান্ত কালোটাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর।
গ্রাম থেকে শহরে কাজ করা শ্রমিকের পরিবারের মাসের বাজার চলে এই এমএফএসের টাকায়। ছোট দোকানদার, অনলাইন ব্যবসায়ী, দিনমজুর—তাদের প্রতিদিনের লেনদেনের শিরা-উপশিরায় এখন ডিজিটাল টাকা। হঠাৎ এই সীমাবদ্ধতা অনেকের জন্য হয়ে উঠেছে অচলাবস্থা। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় জরুরি পরিস্থিতিতে।

হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে ভর্তি থাকা রোগী, আইসিইউতে শ্বাস নিতে লড়াই করা মানুষ—এদের ক্ষেত্রে সময় মানেই জীবন। অনেক সময় মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠাতে না পারলে থেমে যায় চিকিৎসা। সেই মুহূর্তে এক হাজার টাকার সীমা কিংবা ব্যাংক অ্যাপ বন্ধ থাকার অর্থ শুধুই নিয়ম নয়—এটা হয়ে ওঠে অসহায়ত্বের প্রতীক। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মার্চেন্ট পেমেন্ট ও বিল পরিশোধ স্বাভাবিক থাকবে এবং সন্দেহজনক লেনদেন নজরদারিতে থাকবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—সব হাসপাতাল, সব ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা সব জরুরি সেবায় মার্চেন্ট পেমেন্ট কার্যকর নয়। অনেক জায়গায় এখনও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনই শেষ ভরসা। সমালোচকদের মতে, অপরাধ দমনের নামে সার্বিক লেনদেন সীমিত করা হলে অপরাধীরা বিকল্প পথ খুঁজে নেয়, কিন্তু সাধারণ মানুষ পড়ে যায় অনিশ্চয়তায়।
কালোটাকার বড় স্রোত যে পথে চলে, সেখানে এই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও উঠছে : রাষ্ট্রকে কালোটাকার বিরুদ্ধে লড়তেই হবে—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই লড়াই যেন নিরীহ মানুষের জীবনযাত্রাকে পিষ্ট না করে। নীতির কঠোরতার পাশাপাশি মানবিক বিবেচনাও জরুরি।
কারণ একটি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ, একটি নীতি প্রয়োজনীয়—কিন্তু একটি জীবন তার চেয়েও বেশি মূল্যবান : আশা করা যায়, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় জরুরি পরিস্থিতি, চিকিৎসা ব্যয় ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে। না হলে কালোটাকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাঝেই হারিয়ে যেতে পারে কিছু নীরব কান্না, কিছু থেমে যাওয়া জীবন।
