
নিজস্ব প্রতিবেদক : উন্নয়নের আড়ালে যেন গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য “কাজ বাণিজ্যের সাম্রাজ্য”। আর সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিট। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ—এখানে সরকারি বিধি নয়, নিয়ন্ত্রণ চলে কমিশন, প্রভাব আর সিন্ডিকেটের ইশারায়।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্পেশাল ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং তার দোসর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বদরুল আলম খান।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, যেখানে শত শত কোটি টাকার সরকারি কাজ ভাগ-বাটোয়ারা হচ্ছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে।

“অগ্রিম কমিশন” না দিলে মিলছে না কাজ ! ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্পেশাল ইউনিটে এখন টেন্ডার যেন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। অভিযোগ রয়েছে, কাজের এস্টিমেট আগেই ফাঁস করে দেওয়া হয় পছন্দের ঠিকাদারদের কাছে। বিনিময়ে নেওয়া হয় ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম কমিশন।

অর্থাৎ—আগে ঘুষ, পরে টেন্ডার ! ক্ষুব্ধ ঠিকাদারদের অভিযোগ, অনেক লাইসেন্সধারী ঠিকাদার অগ্রিম টাকা দিয়েও কাজ পাননি। আবার যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট কোম্পানি থেকে মালামাল কেনার শর্ত। কেউ সেই নির্দেশ অমান্য করলে চুক্তি বাতিলের মৌখিক হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দপ্তরে মানসম্পন্ন সরবরাহ করা বহু পুরোনো ঠিকাদার কার্যত বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কি এখন একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে ?

৩০০ কোটি টাকার কাজ ভাগাভাগি ও হাতবদলের অভিযোগ : সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পিপিডব্লিউডি উড ডিভিশনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাজ আসার পর শুরু হয় বড় ধরনের তদবির ও লবিং। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বদরুল আলম খানকে তার অনৈতিক সুবিধা হাসিল করতে কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে অবৈধ সুবিধাবাদী হস্তক্ষেপ করান । সূত্র বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপিপিভুক্ত কাঠের কাজ পরে কৌশলে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলীর সামনেই দুই পক্ষ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বদরুল আলম খান এর বিরুদ্ধে ।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর ছোট ভাই “মামুন”-এর নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা দাবি করার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদার মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
প্রধান বিচারপতির বাসভবনের কাজ নিয়েও প্রশ্ন : সবচেয়ে বেশি সমালোচনা তৈরি হয়েছে প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনের কাজের মান নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সেখানে নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম এবং অফিসকেন্দ্রিক নানা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।
সূত্রের দাবি, এসব বিতর্ক চাপা দিতেই সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার তড়িঘড়ি করে জাহাঙ্গীর আলমকে রাজশাহীতে বদলি করেছিলেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে মাত্র আট মাসের মাথায় তিনি আবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—কোন প্রভাব বলয়ে সম্ভব হলো এমন প্রত্যাবর্তন ?
“ফার্নিচার সিন্ডিকেটে” কোটি কোটি টাকার কাজ৷ : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কয়েকটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের নাম। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম মূলত হাতিল, পশ ফার্নিচার, রিগেল ফার্নিচার, আকতার ফার্নিচার ও ডট ফার্নিচারসহ নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ বণ্টন করেন। বিশেষ করে “ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক উত্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ২০২৫/১৩ নং লট : ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার ৮০২ টাকা, ২০২৫/৩ নং লট : ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার ৯০২ টাকা, ২০২৫/৪ নং লট : ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার ৯০২ টাকা, এছাড়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে— রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ২৭ লাখ টাকা,
শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরিতে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং পাবলিক লাইব্রেরি বহুমুখী ভবনে প্রায় ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—মূল ভবনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে ফার্নিচার সরবরাহের চুক্তি সম্পন্ন হয়? পরিকল্পনা, অনুমোদন ও বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে সমন্বয় কোথায়?

তদন্ত চলমান, তবুও বদরুলের অবৈধ সুবিধাবাদী সহযোগিতায় দেড়শ কোটি টাকার টেন্ডারের অনুমতি ! সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে একটি, গণপূর্ত অধিদপ্তরে একটি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ একটি তদন্ত চলমান রয়েছে।
তারপরও বদরুল আলম খান এর অবৈধ কমিশন বানিজ্যের সহায়তায় কীভাবে তিনি দেড়শ কোটি টাকার নতুন টেন্ডার কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পান—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভেতরেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব বলেন, “রিপোর্টটি আগেই দেওয়ার কথা ছিল। কেন দেওয়া হয়নি জানি না। তবে আমি আবার চিঠি দেব দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য।”
বদরুল–জাহাঙ্গীর সিন্ডিকেট নিয়ে প্রশাসনে চাপা অস্বস্তি :
গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র বলছে, স্পেশাল ইউনিটকে ঘিরে এখন তীব্র অস্বস্তি বিরাজ করছে প্রশাসনের ভেতরেই।
অভিযোগ উঠেছে—টেন্ডার, এস্টিমেট, বিল, সরবরাহ—সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে একটি নির্দিষ্ট চক্র । ঠিকাদারদের ভাষ্য, এখানে কাজ পেতে হলে যোগ্যতা নয়, প্রয়োজন “যোগাযোগ” এবং “কমিশন”। আর সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রেই রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান ও নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম।
অভিযুক্তদের বক্তব্য : অভিযুক্ত বদরুল আলম খান এর বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে একাধিক বার যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় তার কোন প্রকার বক্তব্য প্রকাশিত হলো না।
তবে অপর অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রথমে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনে চলমান অভিযোগ তদন্তে কীভাবে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে—এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান তিনি।
তদন্ত ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয় : এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য ভুক্তভোগী ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং প্রাপ্ত নথির ভিত্তিতে উপস্থাপিত অভিযোগ। বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষ।
তবে প্রশ্ন এখন একটাই— গণপূর্তের এই “স্পেশাল ইউনিট” কি উন্নয়নের কারখানা, নাকি ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অন্ধকার সাম্রাজ্য?
