
নিজস্ব প্রতিবেদক : চারদিকে ধূসর-কালো বর্জ্যের পাহাড় । দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা। অথচ এটি রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের কাছেই—ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল।

প্রতিদিন এখানে জমা হচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার টন বর্জ্য। বছরের পর বছর ধরে জমতে জমতে এই ময়লার স্তূপ এখন প্রায় ১০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। আর এই পাহাড় ঘিরেই গড়ে উঠেছে শত শত কোটি টাকার এক ভয়ংকর ‘বর্জ্য অর্থনীতি’।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন কেবল পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়; এটি পরিণত হয়েছে আর্থিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, পরিবেশ বিপর্যয় এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব দুর্যোগে।

বছরে শত কোটি টাকা, তবু কমছে না দুর্ভোগ : তথ্য বলছে, মাতুয়াইল কেন্দ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বছরে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করছে ডিএসসিসি।

শুধু বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহনেই বছরে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। জ্বালানি তেল, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা—সব মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ আরও ভয়াবহ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে ডিএসসিসির বরাদ্দ ছিল রেকর্ড ৪৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অথচ আগের বছর এই বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩০ কোটি টাকা।
এক বছরের ব্যবধানে কয়েকশ কোটি টাকার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে তখন থেকেই সংস্থার ভেতরে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন শুরু হয়। এছাড়া সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাজেট এখন প্রায় ৫৭০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিপুল অর্থ কোথায় যাচ্ছে ? কেন বাড়ছে না নাগরিক সেবার মান ? কেন এখনও মাতুয়াইল বিষাক্ত গ্যাস আর দূষিত তরলে ঢাকাবাসীর জন্য ‘মরণফাঁদ’ হয়ে আছে ?
‘স্যানিটারি ল্যান্ডফিল’ শুধু কাগজে ? সরেজমিনে দেখা গেছে, মাতুয়াইল এখন তার ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তথাকথিত “স্যানিটারি ল্যান্ডফিল” করার পরিকল্পনা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।
বর্জ্যের বিষাক্ত তরল নির্যাস আশপাশের খাল, জলাশয় ও মাটির নিচের পানিতে মিশে ভয়াবহ দূষণ তৈরি করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি এখন প্রায় ব্যবহার অযোগ্য। বাতাসে এমন দুর্গন্ধ ছড়ায় যে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টাকা তো খরচ হচ্ছে, কিন্তু আমরা বিষ খেয়ে বেঁচে আছি। বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া যায় না।”
কোটি টাকার গাড়ি, কিন্তু তেলের অভাবে বন্ধ সেবা !
মাতুয়াইল গেটে দেখা গেছে সারি সারি আধুনিক কমপ্যাক্টর ও ডাম্প ট্রাক। জাপানি সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে আনা এসব অত্যাধুনিক গাড়ির বাজারমূল্য কোটি কোটি টাকা।
কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ বাস্তবতা—গাড়ি আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। ফলে দামি অনেক গাড়ি দিনের পর দিন গ্যারেজে পড়ে থাকে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, “এ যেন শুভঙ্করের ফাঁকি। কোটি টাকার গাড়ি কেনা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর তেল বরাদ্দ কমানো হয়েছে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল অব্যবস্থাপনা নয়; বরং পরিকল্পনাহীন ব্যয় ও আর্থিক অনিয়মের বড় উদাহরণ।
‘ময়লা’ এখন আয়ের খনি ! অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ডিএসসিসির কাছে বর্জ্য এখন শুধু সমস্যা নয়—বড় ধরনের আয়ের উৎসও। শুধু ডাম্পিং সাইট ইজারা দিয়েই এবার ৩০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। পশুর হাট থেকেও আয় হবে প্রায় ২৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই ‘বাণিজ্যিকীকরণ’-এর কারণে সেবার মান ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। জনগণের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আর্থিক স্বার্থ।
প্রতিদিন ১৫ লাখ টাকা খরচ, তবু নেই স্থায়ী সমাধান :
তথ্য অনুযায়ী, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের দৈনিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ২ লাখ টাকা। প্রতি টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় খরচ হচ্ছে প্রায় ৪২৬ টাকা।
অর্থাৎ প্রতিদিন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে এই বর্জ্যের পাহাড় সামলাতে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবে এই বিপুল ব্যয় কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারছে না।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, তবু বিষাক্ত নগরী : ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ ও স্যানিটারি ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ১১২ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প চলছে। দিনরাত কাজ করছেন প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এর মধ্যে ল্যান্ডফিলের ভেতরে সরাসরি কাজ করেন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন শ্রমিক।
দৈনিক গড়ে ৪৭৫ টাকা মজুরিতে জীবনবাজি রেখে কাজ করা এসব শ্রমিকের পেছনে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু এত বিপুল বিনিয়োগের পরও মাতুয়াইল আজ জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
‘ডাম্পিং সংস্কৃতি’ থেকে বের হতে পারেনি ঢাকা : নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার মূল সংকট হলো—আমরা এখনও “ডাম্পিং” মানসিকতা থেকে বের হতে পারিনি।
তার ভাষায়, “শত শত কোটি টাকা খরচ করে গাড়ি কেনা হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর তদারকি নেই। বাসা-বাড়িতে বর্জ্য আলাদা করা হয় না। ফলে পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে ল্যান্ডফিলের ওপর।” তিনি আরও বলেন, “দামি জাপানি গাড়ি কিনেও যদি তেলের অভাবে ময়লা সংগ্রহ বন্ধ থাকে, তাহলে সেটি পরিকল্পনাহীন ব্যয় ছাড়া কিছু নয়।”
ড. আদিল মনে করেন, কাগুজে বাজেট আর বড় বড় প্রকল্প দিয়ে পরিচ্ছন্ন শহর গড়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা।
‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’—স্বপ্ন নাকি নতুন বাণিজ্য ? ডিএসসিসি এখন ২০৩২ সালের মধ্যে “ক্লিন ঢাকা মাস্টার প্ল্যান” বাস্তবায়নের কথা বলছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে।
ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া দাবি করেন, “ময়লা ফেলার জায়গা বাড়ানোর যুগ শেষ।
এখন ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রযুক্তির দিকে যেতে হবে।” তিনি জানান, কোরীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রতিদিন ৩২০০-৩৫০০ টন বর্জ্য থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন— যে সংস্থা আজকের বর্জ্যই সুষ্ঠুভাবে সামলাতে পারছে না, তারা কি সত্যিই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান বাস্তবায়ন করতে পারবে? নাকি এটিও হবে হাজার কোটি টাকার নতুন আরেক ‘মেগা বাণিজ্য’?
ময়লার নিচে চাপা পড়ছে ‘ক্লিন ঢাকা’র স্বপ্ন : মাতুয়াইল এখন শুধু একটি ল্যান্ডফিল নয়; এটি রাজধানীর ভয়াবহ প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পরিকল্পনাহীনতা এবং আর্থিক অস্বচ্ছতার প্রতীক। বছরের পর বছর বাজেট বাড়ছে, প্রকল্প বাড়ছে, গাড়ি বাড়ছে, বরাদ্দ বাড়ছে—কিন্তু বাড়ছে না নাগরিক স্বস্তি। উল্টো প্রতিদিন বিষাক্ত গ্যাস, দূষিত পানি আর উৎকট দুর্গন্ধে বিপন্ন হয়ে উঠছে হাজার হাজার মানুষের জীবন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট— স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে, দুর্নীতি ও ‘ময়লা বাণিজ্য’ বন্ধ না করলে, পরিচ্ছন্ন ঢাকার স্বপ্ন চিরতরে চাপা পড়ে থাকবে মাতুয়াইলের বর্জ্যের পাহাড়ের নিচেই।
