
নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সাজাপ্রাপ্ত পুলিশের নয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে সরকার। আদালতের রায়, সাজা পরোয়ানা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা অনুবিভাগ থেকে শুরু হয়েছে আইনানুগ প্রক্রিয়া।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাজাপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪২ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড বা এক বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে, আদেশ জারির তারিখ থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হবেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২–এর পৃথক মামলায় পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে সাজা দেওয়া হয়েছে।

সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকা : সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন— পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নূরুল ইসলাম, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, রমনা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম, ডিএমপির সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল

পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পর শুরু প্রশাসনিক পদক্ষেপ :
চলতি মাসের ৬ জুলাই পুলিশ সদরদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে আদালতের রায় ও সাজা পরোয়ানার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, “আদালতের রায়, সাজা পরোয়ানা ও আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। অপরাধে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে।”
কারও অপসারণ, কারও সাময়িক বরখাস্ত : সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪২ ধারা অনুযায়ী চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নূরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাজশাহী-রংপুর রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীকে সাময়িক বরখাস্ত করে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে (বিপিএ) সংযুক্ত করা হয়েছে।
সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফীকে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। তিনি বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন।
রমনা বিভাগের সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে সিলেট ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর মামলায় সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন। তাকে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিএমপির সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে সাময়িক বরখাস্ত করে কক্সবাজারের উখিয়ায় ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) সংযুক্ত করা হয়েছে।
রায়ের পর প্রশাসনে বড় বার্তা : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সাজাপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণকে প্রশাসনিক জবাবদিহিতার বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আদালতের নির্দেশনা ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
