কাস্টমস বন্ডে ‘ঘুষের সাম্রাজ্য ’: বন্ড লাইসেন্সের অবৈধ অর্থে রাজস্ব কর্মকর্তা মাসুমের স্ত্রীর নামে রহস্যময় সম্পদের পাহাড় !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক  :   জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসার পর প্রশাসনিক প্রভাব ও অঘোষিত তদবিরের মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা পাশ কাটিয়ে তিনি বাগিয়ে নিয়েছেন কমিশনারেটের মূল কেন্দ্রবিন্দু ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’র পদ।


বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধ মাসোহারা আদায় এবং অর্জিত বিপুল অর্থ দিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় স্ত্রীর নামে বিপুল ভূ-সম্পত্তি কেনার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। হেডকোয়ার্টার পদের অপব্যবহার ও কোটি টাকার মাসোহারা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন : (০৮.০১.০০০০.০০১১.০৫.০০৪.২০২০-৬৪১, তারিখ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫) অনুযায়ী বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ যোগদানের পরপরই সিনিয়রটি ও প্রশাসনিক নিয়মকানুন উপেক্ষা করে হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তার পদ দখল করেন মাসুম। অনুসন্ধানে জানা যায়, বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল আটকে রাখা, অডিট শিথিল করা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে অনৈতিক আর্থিক সমঝোতা করে আসছেন তিনি।


বিজ্ঞাপন

এছাড়া ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রম থেকে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে, যা একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয়ের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।


বিজ্ঞাপন

গুলশানে স্ত্রীর নামে ভূ-সম্পত্তির পাহাড় ও নথিতে মারাত্মক অসামঞ্জস্য  :  মাসুমের অনৈতিক উপার্জনের বড় একটি অংশ ব্যবহার করা হয়েছে তার গৃহিণী স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে জমি ক্রয়ে। লিপির দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর গুলশান রাজস্ব সার্কেলের ভাটারা মৌজায় (জেএল নং ১৫) তার নামে বিপুল সম্পত্তি নিবন্ধিত হয়েছে (নামজারি খতিয়ান নং ২৯৭১৬, দাগ নং ২০৭৬৩)। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে খুলনার সোনাডাঙ্গার স্থায়ী বাসিন্দা লিপির নামে এই ভূ-সম্পত্তি কেনা হয়।

তবে সরকারি নথিপত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জমির পরিমাণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের গরমিল দেখা গেছে:

মূল নামজারি খতিয়ান: ০.৪০০০ একর (৪০ শতাংশ বা ২৪ কাঠা)। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: ৪.৯৬ একর (প্রায় ৩০০ কাঠা)।বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ভাটারা এলাকায় কাঠাপ্রতি জমি ৬০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকা হিসাবে ৪০ শতাংশ জমির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ১৫ থেকে ৩৬ কোটি টাকা। অপরদিকে, ডিজিটাল রেকর্ডে প্রদর্শিত ৪.৯৬ একর জমির বর্তমান মূল্য ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। একজন রাজস্ব কর্মকর্তার প্রকাশ্য বৈধ আয় দিয়ে রাজধানীর মতো জায়গায় এত টাকার সম্পদ কেনা অসম্ভব বলে খোদ বন্ড কমিশনারেটের ভেতরেই তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানেও সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জাতীয় রাজস্ব ও ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব  :  কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শীর্ষ প্রশাসনিক কেন্দ্রে বসে ফাইল আটকে মাসোহারা আদায়ের ফলে একদিকে রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বন্ড সুবিধার চরম অপব্যবহার ঘটছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন সাবেক কর্মকর্তা জানান, হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা পুরো কমিশনারেটের পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করেন। এই পদে বসে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি করা হলে তা আর ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে রূপ নেয়।

দুদকের হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি  : ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম (জন্ম: ০৭ জানুয়ারি ১৯৮২) রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং ‘ঘুষ কালেক্টর’ হিসেবে কাজ করছেন। বৈধ কাজ সম্পাদন করতে গেলেও তার অনৈতিক দাবির মুখে পড়তে হচ্ছে।

এনবিআরের ভাবমূর্তি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সুরক্ষায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন ২০০৪ ও দণ্ডবিধির আওতায় অবিলম্বে তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ী মহল ও সংশ্লিষ্টরা বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম ও তার পরিবারের বিষয়ে নিম্নোক্ত আইনি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন:পরিবারসহ তার সব ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অবিলম্বে জব্দ ও যাচাই করা। ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউস সংক্রান্ত লেনদেনের নথি এবং মাসুমের স্বাক্ষরিত ফাইল নোটিং অডিট করা। সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবানবন্দি নেওয়া এবং কল ডিটেইল রেকর্ড (CDR) পর্যালোচনা করা।

এদিকে অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, অপকর্ম ধামাচাপা দিতে ও আইনি ব্যবস্থার হাত থেকে বাঁচতে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম দ্রুত কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর) থেকে চট্টগ্রামে বদলি হতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জোর লবিং ও তদবির শুরু করেছেন।

👁️ 37 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *