
বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) মো : সাইদুর রহমান।নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) মো. সাইদুর রহমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে আলোচনা।

একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা সামনে এসেছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যাচ্ছে—তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পরিসমাপ্ত করা হয়েছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) মো. কামরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের স্মারক নম্বর ০০.০১.০০০০.০০০.৫০১.০১.০০৩৭.১৭.১৫ পত্রে এ তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।
পত্রটিতে বলা হয়েছে, উল্লিখিত অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক অভিযোগটি চূড়ান্তভাবে পরিসমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে সাইদুর রহমানকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে কোনটি নথিভিত্তিক, কোনটি অভিযোগমাত্র এবং কোনটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়নি—তা পৃথক করে দেখার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

‘অভিযোগের আড়ালে স্বার্থান্বেষী মহল ?’ বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, দীর্ঘ কর্মজীবনে সাইদুর রহমান পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতার কারণে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে তদন্ত বা যাচাইয়ের আগে কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যেসব প্রকল্প, সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রে একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর প্রকৃত দায়িত্ব, এখতিয়ার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটুকু ছিল—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ কোনো প্রকল্পের সঙ্গে একজন কর্মকর্তার নাম যুক্ত থাকলেই সংশ্লিষ্ট সব সিদ্ধান্তের দায় তাঁর ওপর বর্তায় না; প্রকৃত ভূমিকা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা জরুরি।
সহকর্মীদের কণ্ঠে আস্থার প্রতিধ্বনি : সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে একজন প্রকৌশলী হিসেবে সাইদুর রহমান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কারণেই তিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে একই সঙ্গে ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি উড়িয়ে না দিয়ে যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। তাঁর মতে, অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হলো নথি যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্ত।
দুদকের নথিতে কী আছে ? সাইদুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান পরিসমাপ্তির বিষয়টি এ বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের দুদকের সংশ্লিষ্ট পত্র অনুযায়ী, অভিযোগটি অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় তা চূড়ান্তভাবে পরিসমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ওই অভিযোগের ক্ষেত্রে দুদকের অনুসন্ধানী প্রক্রিয়ার পর কোনো প্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসেনি। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প বা সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন কোনো অভিযোগ থাকলে সেটির সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচ্য—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাইদুর রহমানের বক্তব্য, ‘সত্য কখনো চাপা থাকে না’ : নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ ও অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যম কে বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) মো. সাইদুর রহমান বলেন, কর্মজীবনে তিনি সবসময় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করাই তাঁর অবস্থান বলে জানান তিনি।
প্রকাশিত সংবাদগুলোর প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা সমাজের অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অনুসন্ধান করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব। তবে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়াও সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি।
সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহলের সরবরাহ করা তথ্যের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট নথি, সরকারি সিদ্ধান্ত, প্রকল্পের কাগজপত্র এবং প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, সত্য উদ্ঘাটনের জন্য সাংবাদিকদের অনুসন্ধানকে তিনি স্বাগত জানান। কিন্তু মিথ্যা, বানোয়াট কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশিত হলে শুধু একজন কর্মকর্তার ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; তাঁর পরিবার, সামাজিক অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সাইদুর রহমান বলেন, সময়ই সবকিছুর নির্ণায়ক এবং সত্য কখনো চাপা থাকে না।
প্রশ্ন এখন একটাই—অভিযোগের সত্যতা কোথায় ? সাইদুর রহমানকে ঘিরে চলমান বিতর্কে তাই মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—প্রকাশিত অভিযোগগুলোর পেছনে কী ধরনের নথি ও প্রমাণ রয়েছে, তাঁর প্রকৃত প্রশাসনিক ভূমিকা কতটুকু এবং কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান বা তদন্তের ফলাফল কী?
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।
দুদকের নথিতে একটি অভিযোগের পরিসমাপ্তির তথ্য এবং সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে নতুন করে উত্থাপিত অভিযোগ—দুই বিষয়কে একই পাল্লায় না মেপে পৃথকভাবে যাচাই করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই যাচাইয়ের কেন্দ্রে থাকা উচিত নথি, প্রমাণ, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং প্রকৃত দায়িত্বের সীমা। কারণ অভিযোগের শিরোনাম যতই চাঞ্চল্যকর হোক, শেষ কথা বলবে প্রমাণই।
