গণপূর্তের আলমগীর খানকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়  :  সম্পদ, প্রকল্প ব্যয় ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অনুসন্ধানের দাবি

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন ময়মনসিংহ রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম পি অ্যান্ড ডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থের অনিয়মিত ব্যয়, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং স্বজনদের মাধ্যমে ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

 

গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ধানমন্ডির বাসিন্দা এলাহী নেওয়াজ খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী বরাবর এ আবেদন করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। একই অভিযোগের অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার। তবে অভিযোগপত্রে উত্থাপিত তথ্যগুলো সরকারি অর্থের ব্যবহার, সম্পদ অর্জন এবং গণপূর্তের প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।


বিজ্ঞাপন

সম্পদের পাহাড়, আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য কতটা  ?
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, মো. আলমগীর খান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল বাড়ি ও খামারবাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে পরিবারের সদস্যদের নামে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—এই সম্পদের পরিমাণ তার ঘোষিত ও বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না ? অভিযোগকারী আলমগীর খান ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তদন্তে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করা গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

বিদেশে অর্থ পাচার ও কানাডায় বিনিয়োগের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার এবং কানাডায় বাড়ি কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগে ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধান প্রয়োজন।

তবে এ অভিযোগের পক্ষে অভিযোগকারী কী ধরনের নথি বা প্রমাণ জমা দিয়েছেন, তার বিস্তারিত প্রকাশ্যে জানা যায়নি। ফলে অভিযোগটি সত্য কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আর্থিক গোয়েন্দা ও তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানই গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে সিসিটিভি: কোটি টাকা ব্যয়ের পরও প্রশ্ন
অভিযোগপত্রের সবচেয়ে গুরুতর অংশগুলোর একটি জাতীয় স্মৃতিসৌধে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন-সংক্রান্ত ব্যয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের জুনে জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় সিসিটিভি-সংক্রান্ত সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য অল্প সময়ের ব্যবধানে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তিনটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কাজ সম্পূর্ণ হয়েছিল কি না এবং স্থাপিত সরঞ্জাম বাস্তবে কতটা কার্যকর ছিল—এ নিয়ে অডিট পর্যবেক্ষণে প্রশ্ন ওঠে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, অডিট কর্মকর্তারা পরিদর্শনের সময় জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় স্থাপিত কিছু ক্যামেরাকে ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় দেখতে পান। প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল থাকা সত্ত্বেও সরঞ্জামগুলো যথাযথভাবে কাজে না লাগার বিষয়টিও অডিট পর্যবেক্ষণে উঠে আসে বলে দাবি করা হয়েছে।

অর্থাৎ, সরকারি কোষাগার থেকে কোটি টাকা ব্যয়ের পর যদি স্থাপিত নিরাপত্তা সরঞ্জাম কার্যকরভাবে ব্যবহারই না হয়, তাহলে সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

দুটি গাড়ির বিপরীতে ৩১ চালক—বছরে ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ  :  গণপূর্তের ই/এম বিভাগের একটি শাখায় গাড়ির তুলনায় অস্বাভাবিক সংখ্যক চালক নিয়োগ ও তাদের পেছনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মাত্র দুটি সরকারি গাড়ির বিপরীতে ৩১ জন চালকের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

যদি অভিযোগের তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে দুটি গাড়ির বিপরীতে ৩১ চালক কেন প্রয়োজন হয়েছিল—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়োগের বৈধতা, প্রকৃত উপস্থিতি, দায়িত্ব পালন এবং সরকারি অর্থ গ্রহণের হিসাবও যাচাই করা প্রয়োজন।

অনুমোদিত জনবল থাকার পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ?
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, অনুমোদিত জনবল কাঠামো থাকা সত্ত্বেও দৈনিক মজুরি, চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদন, নিয়োগের নথি, হাজিরা খাতা, বেতন-ভাতা প্রদানের তথ্য এবং কর্মীদের বাস্তব উপস্থিতি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

বিশেষ করে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের অডিট পর্যবেক্ষণে এসব আর্থিক অসঙ্গতির কিছু বিষয় উঠে এসেছিল বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। প্রশ্ন হলো—অডিটে আপত্তি ওঠার পর সেগুলোর নিষ্পত্তি কীভাবে হলো এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম পি অ্যান্ড ডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খান।

স্বজনদের মাধ্যমে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ  :  মো. আলমগীর খানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—প্রভাবশালী অবস্থান কাজে লাগিয়ে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত থাকা এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

অভিযোগকারী দাবি করেছেন, গণপূর্তের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি কার্যক্রমে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

তবে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, অংশীদারিত্ব, ব্যাংক লেনদেন, কার্যাদেশ, দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন এখন তদন্তের  :  আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে নিছক অভিযোগ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—আবার তদন্ত ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। তাই অভিযোগপত্রে উত্থাপিত প্রতিটি বিষয় নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে— তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস; ব্যাংকের এফডিআর ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন; আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী; বিদেশে অর্থ, সম্পদ বা বিনিয়োগের তথ্য; জাতীয় স্মৃতিসৌধের সিসিটিভি প্রকল্পের কার্যাদেশ ও বিল; অডিট আপত্তি ও তার নিষ্পত্তির নথি; ৩১ চালকের নিয়োগ ও বেতন-ভাতার হিসাব; চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের বৈধতা; আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য যোগসূত্র—এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি স্পষ্ট হতে পারে।

আলমগীর ও প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি  : 
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আলমগীর খানের হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর হোয়াটসঅ্যাপেও যোগাযোগ করা হয়। তিনিও মোবাইল ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্যও পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

শেষ কথা  :  সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকা জনগণের। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণ করা জরুরি। একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের বাইরে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন বা স্বজনদের মাধ্যমে ঠিকাদারি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও সেটি যথাযথ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

এখন দেখার বিষয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, দুদক, বিএফআইইউ এবং সংশ্লিষ্ট আয়কর কর্তৃপক্ষ অভিযোগপত্রে উত্থাপিত বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করে। অভিযোগের সত্যতা নথিপত্রে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার দায়মুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান।

👁️ 42 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *