গণপূর্তের লাইসেন্স শাখায় ঘুষের ‘সাম্রাজ্য ’! বিধি ভেঙে ঠিকাদারি লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোটি টাকার বাণিজ্যের তথ্য—দৃষ্টি আকর্ষণ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার অভিযোগের তীর উঠেছে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স শাখার দিকে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, বিধি-বিধান ও নির্ধারিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে অর্থের বিনিময়ে নতুন ঠিকাদারি লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, আবেদন গ্রহণ এবং নথি যাচাইয়ের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিলা ইসলাম (ওএন্ডএম)। তাঁর সঙ্গে লাইসেন্স শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মচারীর সমন্বয়ে কথিত এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন—শিপন মিয়া, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক; মো. আল-আমিন, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক; মো. অহিদুল ইসলাম, উচ্চমান সহকারী এবং মো. আমিনুল ইসলাম (সুপার)। এছাড়া মো. হান্নান, ঢাকা গণপূর্ত জোনের সাবেক অফিস সহায়ক, অবসর নেওয়ার পরও সাকিলা ইসলামের কথিত ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

লাইসেন্সভেদে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ? অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন ঠিকাদারি লাইসেন্স কিংবা সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে লাইসেন্সভেদে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আদায়কৃত অর্থের একটি বড় অংশ নির্বাহী প্রকৌশলী (ওএন্ডএম)-এর কাছে যায় এবং বাকি অর্থ কথিত সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স শাখার চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ না দিলে ফাইল এগোয় না। এমনকি নতুন লাইসেন্সের পাশাপাশি ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়নেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করতে হয় বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।


বিজ্ঞাপন

ঈদের ছুটির আগের দিন ‘বিশেষ’ লাইসেন্স ! সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ১৫৬১ ও ১৫৬২ স্মারকে দেওয়া কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সিভিল/সম্মিলিত লাইসেন্স নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঈদের ছুটির আগের দিন মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, এ ধরনের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে গঠিত কমিটির যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে এসব লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
এমনকি মাঠপর্যায়ের একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী এসব লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে অবহিত ছিলেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞপ্তির শর্ত বনাম বাস্তব চিত্র : ২০২৫ ও ২০২৬ সনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির বিষয়ে গত বছরের ১৩ অক্টোবর তারিখে কাজী মোহাম্মদ ফিরোজ হাসান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা—স্বাক্ষরিত ৮৫২ স্মারকের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে আগ্রহী ঠিকাদার/ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এক হাজার টাকা আবেদন ফি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়।

প্রক্রিয়া অনুযায়ী, আবেদনকারীদের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে আবেদন যাচাই করে সুপারিশ পাঠানোর কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া সর্বত্র অনুসরণ করা হয়নি।

মানি রিসিট টেম্পারিং, সময় পার হওয়ার পরও আবেদন :অনুসন্ধানে অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে আরও বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম। এর মধ্যে রয়েছে—মানি রিসিট টেম্পারিং বা রসিদে কারসাজি, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও আবেদন গ্রহণ, নির্দিষ্ট কোম্পানির প্যাডে লাইসেন্স শাখার নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর না থাকা, মাঠপর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সুপারিশ ছাড়াই লাইসেন্স প্রদান, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ।

মাঠপর্যায়ের একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার দাবি করে অভিযোগকারীরা বলেছেন, অর্থ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া কঠিন।

তিন হাজার আবেদন ঘিরে কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ  : একাধিক সূত্রের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন শাখায় প্রায় তিন হাজার নতুন ঠিকাদারি লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়ে। বিপুলসংখ্যক এই আবেদনকে কেন্দ্র করে নিয়মনীতি অনুসরণের পরিবর্তে অর্থের অঙ্কের ভিত্তিতে দরকষাকষির মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, লাইসেন্স শাখায় আবেদন যত বেশি, কথিত সিন্ডিকেটের ‘বাণিজ্য’ তত বেশি। ফলে একটি সরকারি সেবাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে অনিয়মের বিশাল ক্ষেত্র।

এক বছরেই ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ ’!   লাইসেন্স শাখায় পোস্টিং নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। একাধিক সূত্রের দাবি, অর্থের বিনিময়ে কেউ কেউ এই শাখায় পদায়ন নিয়েছেন। এরপর সেখানে এক বছর দায়িত্ব পালন করেই অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাজধানী ঢাকা এবং নিজ নিজ এলাকায় আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ রয়েছে। যদিও এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস ও বৈধতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

সরকারি দপ্তরের সিল বানিয়ে স্বাক্ষর জালের অভিযোগ :
অভিযোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো—গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সিল অবৈধভাবে তৈরি করে এবং স্বাক্ষর জাল করে কথিত সিন্ডিকেটের কেউ কেউ লাইসেন্স-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সরকারি নথি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

অভিযোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অনৈতিকতার কথাও  :  সাকিলা ইসলামের বিরুদ্ধে : ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা অভিযোগও প্রচারিত হচ্ছে। তবে এসব ব্যক্তিগত অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া সেগুলোকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। এ ধরনের বিষয় তদন্তের আওতায় এলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ পুরোনো, ব্যবস্থা কোথায় ?  সংশ্লিষ্টদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের লাইসেন্স শাখার অনিয়ম নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি ঠিকাদারি লাইসেন্স প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ায় যদি সত্যিই ঘুষ, জালিয়াতি ও বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম চলে, তাহলে এতদিনেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ : গণপূর্ত অধিদপ্তর সরাসরি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। তাই লাইসেন্স শাখা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে ১৫৬১ ও ১৫৬২ স্মারকে দেওয়া লাইসেন্স, ২০২৫-২৬ সালের নতুন লাইসেন্সের আবেদন, যাচাই-বাছাই কমিটির কার্যবিবরণী, মানি রিসিট, অনুমোদন নথি, মাঠপর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সুপারিশ, সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অনুমোদন এবং লাইসেন্স শাখার আর্থিক লেনদেন—সবকিছু নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে অডিট/তদন্ত করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।

একই সঙ্গে অভিযোগে নাম আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব, পদায়নের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে তাদের দায়িত্ব পালনের নথিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় প্রশ্ন : সরকারি ঠিকাদারি লাইসেন্স কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধানের আওতায় পরিচালিত একটি প্রশাসনিক সেবা। ফলে ঘুষ বা প্রভাবের বিনিময়ে লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অন্যদিকে, অভিযোগগুলো মিথ্যা হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও তা পরিষ্কার করার সুযোগ দিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত—অভিযোগকে যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি তদন্তের আগে কাউকে দোষীও সাব্যস্ত করা যায় না।

প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। কয়েকজন কর্মচারী ফোন ধরলেও বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়ে পরে সরাসরি কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন।

এখন দেখার বিষয়—গণপূর্ত অধিদপ্তরের লাইসেন্স শাখাকে ঘিরে ওঠা ঘুষ, অনিয়ম, নথি জালিয়াতি ও বিধিবহির্ভূত লাইসেন্স প্রদানের অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর কী পদক্ষেপ নেয়।অভিযোগগুলোর পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত থাকার দাবি করা হয়েছে। সেসব নথি যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ তদন্তই পারে কথিত ‘লাইসেন্স সিন্ডিকেটের’ প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে।

👁️ 25 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *