
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ২৭ সদস্যের কমিটি ঘোষণাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কমিটি অনুমোদনের কাগজে নিজের স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। তিনি ওই স্বাক্ষরকে ‘কম্পিউটারে তৈরি’ এবং ‘কারসাজি করা’ বলে দাবি করেছেন।

এ ঘটনায় কমিটি গঠন ও অনুমোদনপত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি এখন বিআইডব্লিউটিএ, শ্রম অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট মো. মাজহারুল ইসলামকে সভাপতি এবং মো. মাইনউদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করে বিআইডব্লিউটিএ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ২৭ সদস্যের একটি কমিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়।

প্রচারিত কমিটির অনুমোদনপত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমের অনুমোদন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কমিটি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই বিষয়টি নতুন মোড় নেয়।

কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন দাবি করেন, কমিটি অনুমোদনের কাগজে যে স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে, সেটি তাঁর নয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্যাডে একটি ‘জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করেন কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। বিজ্ঞপ্তিতে বিআইডব্লিউটিএ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটির জন্য তৈরি করা একটি কাগজে তাঁর নামে প্রদর্শিত স্বাক্ষরকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটির জন্য তৈরী করা একটি কাগজ দেখলাম। উক্ত কাগজে আমার যে স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে, তা সঠিক নয়। উক্ত স্বাক্ষরটি আমি করি নাই। ইহা কম্পিউটারে করা স্বাক্ষর। এটা একটি কারসাজি করা স্বাক্ষর। উক্ত স্বাক্ষরটি অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।’
শুধু স্বাক্ষর অস্বীকার করেই থেমে থাকেননি তিনি। বিজ্ঞপ্তিতে ওই স্বাক্ষরকে বাতিল হিসেবে গণ্য করার কথাও স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ওই স্বাক্ষর ব্যবহার করে পরবর্তীতে যেসব নথি বা কার্যক্রম তৈরি করা হবে, সেগুলো কার্যকর হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়। জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এমতাবস্থায়, উক্ত স্বাক্ষরটি বাতিল হিসেবে পরিগণিত হবে। উক্ত স্বাক্ষর দিয়ে যা কিছু সৃষ্ট করা হবে তা কার্য্যকর কিছু হবে না।’

কমিটি নিয়ে প্রশ্ন, এখন স্বাক্ষরই বিতর্কের কেন্দ্রে : বিআইডব্লিউটিএ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটি ঘোষণার পর শুরুতে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও কেন্দ্রীয় সভাপতির জরুরি বিজ্ঞপ্তির পর বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
কারণ, ২৬ আগস্ট প্রচারিত কমিটির অনুমোদনপত্রে কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমের অনুমোদনের কথা বলা হয়েছিল। অথচ ১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় সভাপতির জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর নামে থাকা স্বাক্ষরকেই ‘সঠিক নয়’, ‘কম্পিউটারে করা’ এবং ‘কারসাজি করা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—২৬ আগস্ট প্রচারিত ২৭ সদস্যের কমিটির অনুমোদনপত্রটি কে বা কারা প্রস্তুত করেছে, কী প্রক্রিয়ায় তা প্রচার করা হয়েছে এবং সেখানে কেন্দ্রীয় সভাপতির স্বাক্ষর কীভাবে যুক্ত হলো ? তবে এসব প্রশ্নের কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত বা প্রামাণ্য ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
থানাসহ তিন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পাঠানো বিজ্ঞপ্তি : বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে জরুরি বিজ্ঞপ্তিটির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পাঠানোর ঘটনা।
বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং মতিঝিল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে। পাশাপাশি সংগঠনের নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তিটি সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও অবহিত করা হয়েছে।
‘কমিটি জারি করা স্বাক্ষরটি আমার না’ : এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, ‘কমিটি জারি করা স্বাক্ষরটি আমার না। এটা কম্পিউটারাইজড।’
তাঁর এমন বক্তব্যের পর বিআইডব্লিউটিএতে কমিটি গঠন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদনপত্রে ব্যবহৃত স্বাক্ষরের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে আসল রহস্য : একটি শ্রমিক সংগঠনের কমিটি গঠনের অনুমোদনপত্রে কেন্দ্রীয় সভাপতির স্বাক্ষর ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে স্বয়ং সভাপতির এমন গুরুতর অভিযোগকে ঘিরে এখন স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষ যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে কমিটি অনুমোদনের কাগজটি কোথা থেকে তৈরি হয়েছে, কারা এটি প্রস্তুত ও প্রচার করেছে এবং সেখানে ব্যবহৃত স্বাক্ষর কীভাবে সংযুক্ত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় সভাপতির অভিযোগের পর বিআইডব্লিউটিএ, শ্রম অধিদপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই বা তদন্তে কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না।
একটি ২৭ সদস্যের শ্রমিক সংগঠনের কমিটি ঘোষণার ঘটনা শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নে এসে ঠেকেছে—‘স্বাক্ষরটি কার?’—তার উত্তরই এখন নির্ধারণ করবে আলোচিত কমিটির বৈধতা ও ভবিষ্যৎ।
