হলি আর্টিজান নিয়ে সিনেমা, কঠোর আপত্তি নিহতদের পরিবারের

বিনোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক : পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত হলি আর্টিজানে জঙ্গী হামলার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো পুরো দেশ। ঘটনাটি বহির্বিশ্বেও শোকের ছায়া ফেলেছিলো। এবার সেই ঘটনা নিয়ে নির্মিত হচ্ছে সিনেমা। তবে সেটি বাংলাদেশে নয়, বলিউডে। ছবিটির নাম রাখা হয়েছে ‘ফারাজ’। এটি নির্মাণ করার ঘোষণা দিয়েছেন বলিউড নির্মাতা হানসাল মেহতা।

এমন ঘোষণার পর সিনেমাটি নিয়ে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, জন্ম দিয়েছে কঠোর সমালোচনার। চলচ্চিত্র নির্মাণের সংবাদটি ইতোমধ্যে হামলায় নিহতদের পরিবার-পরিজনের কাছে অত্যন্ত বেদনার কারণ হওয়ায় তারা চলচ্চিত্রটির নির্মার্ণে কঠোর আপত্তি প্রকাশ করছে।

নির্মিত চলচ্চিত্রটি হামলায় নিহতদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করবে, পাশাপাশি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশকে একটি চরম পন্থী রাষ্ট্র হিসাবে এটি বিশ্বের দরবারে দেশের সুনাম ক্ষুন্ন করবে।

একজন নিহতের পরিবারের দাবী করেন, “সেই ভয়াবহ রাতের ঘটনাটি কোনো অবস্থাতেই আমাদের দেশ, আমাদের জাতি ও আমাদের ধর্মকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেনা, বরং এরকম একটি ঘটনার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি মানুষের বিশ্বাসে বিরূপ ধারণার জন্মদিবে যা সর্বোপরি আমাদের দেশের প্রতি অবিচার এবং দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করবে।”

ছবিটির প্রকাশিত টিজার ও নাম থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, যেখানে চলচ্চিত্রটি সেই রাতের ঘটনায় নিহত ‘ফারাজ’ কে কেন্দ্র করে নির্মিত– যিনি ঘটনার সময়ে তার দুজন বন্ধু অবিন্তা কবির ও তারিশি জৈনের সাথে ক্যাফেতে উপস্থিত ছিলেন। তারা তিনজন একই সাথে ঘটনার নির্মমতার শিকার হয়ে সেই রাতে প্রাণ হারান। অবিন্তা কবির ও তারিশি জৈন এর পরিবার চলচ্চিত্রটি নির্মাণ কাজ অনতি বিলম্বে বন্ধ করার জন্যে নির্মাতা হানসাল মেহতা ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক নির্মাতাদের আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

তারা বিবৃতি দেন যে, “সেই রাতের ঘটনা আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য শোকের কারণ, যা আমরা প্রতিনিয়ত বহন করে চলেছি। এরকম একটি ঘটনা যা জন মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, অবিলম্বে এর চিত্রায়ন চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা উচিৎ”।

উপরন্তু, চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পূর্বে নির্মাতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রোডাকশন হাউজ –হামলায় নিহত ব্যক্তিদের কারো পরিবারের কাছ থেকে কোনো প্রকার সম্মতি গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। বিশেষত, অবিন্তা কবির ও তারিশি জৈন এর পরিবারের কাছ থেকে কোনো প্রকার অনুমতি গ্রহণ করা হয়নি – যেখানে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এটির নির্মাণ অসম্ভব।

অবিন্তা কবির এর শোক সন্তপ্ত মা রুবা আহমেদ জানান, “এরকম একটি ঘটনা যা জাতিকে তারা স্তব্ধ করে তুলেছিল। – এটির চিত্রায়ন কখনো কোনো অবস্থাতেই সমীচীন নয়” । তিনি আরও জানান, চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পূর্বে সংশ্লিষ্ট প্রোডাকশন হাউজটি হামলায় নিহতদের পরিবারের কাছ থেকে কোনো প্রকার বৈধ অনুমোদন গ্রহণ না করার মত অসংবেদনশীল আচরণ – তাকে চরম ভাবে হতাশ করেছে।

“নিহত ফারাজ’কে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে এটাই স্বাভাবিক যে আমার মেয়ে (অবিন্তা কবির), তুলিকার মেয়ে (তারিশি জৈন) এবং ঘটনায় অন্যান্য নিহত সকলেই দৃশ্যপটে চলে আসবে। এটা কি করে সম্ভব হয় – যেখানে আমাদের মধ্যে থেকে কারো কাছেই সম্মতি চাওয়া হয়নি? এটি বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছে, সুতরাং শুধুমাত্র একজনের চরিত্র তুলে ধরতে গিয়ে, এটি কি বাকি ২১ জন নিহতদের করুণ বাস্তবতাকে তুচ্ছ করা নয় যারা একই ঘটনার শিকার? এটা কেমন মানবতা?

অবিন্তা কবির ও তারিশি জৈন এর পরিবারবর্গ নির্মাতা মেহতা এবং অন্যান্য চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে সেই রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার শিল্প কর্ম নির্মাণ না করার জন্যে তাদের আপত্তি পেশ করেছেন। নির্মাতাদের তারা অনুরোধ জানান, যাতে পরবর্তী সময়ে তারা এরকম কিছুর পুনরাবৃত্তি না ঘটান – যা তাদের এবং অন্যান্য নিহতদের পরিবারকে সেই ভয়াল রাতের স্মৃতিচারণ করতে বাধ্য করে।

নিউজিল্যান্ড এর ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে ১৫ মার্চ ২০১৯ সালের গোলাগুলির ঘটনাটির উপর ভিত্তি করে পরিচালক এন্ড্রু নিকল তার “দেআরআস” নামক চলচ্চিত্রের নির্মাণ কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যেখানে একজন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য বাদীর হাতে ৫১ জন মুসলমান নিহত হওয়ার ঘটনাটি উঠে আসে। এর খবর প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেখানে তারা চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবী সহ প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেন এমন একটি আপত্তিকর বিষয় নিয়ে নির্মাতাদের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য।

এরপর পরিচালক নিকল প্রতিবাদের জেরে চলচ্চিত্রটি স্থগিত করতে বাধ্য হন, এবং বিবৃতি দেন যে, “তার এই উদ্যোগের কারণে নিহতদের পরিবারকে অনাকাঙ্খিত ভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্যে তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন”। একই মনোভাব মেহতা এবং ‘ফারাজ’ চলচ্চিত্রের সংশ্লিষ্ট অন্যদের কাছেও কাম্য। এমন একটি চলচ্চিত্র যার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান, যা ইসলাম ধর্মকে অপ ব্যাখা করে এবং সর্বোপরি ১লা জুলাই হামলায় নিহতদের আত্মত্যাগের স্মৃতির প্রতি অসম্মানজনক– এটি বিশ্ব দরবারে মুক্তির আগে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের দ্বারা এর পরিপূর্ণ যাচাই করণ অত্যাবশকীয়।