# সাধারণ সভা বা অনুমোদন ছাড়াই স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি # সুদের ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ # দশ বছর ধরে অগণতান্ত্রিক কমিটির দখলে মন্দির #


নিজস্ব প্রতিনিধি, (রাজৈর, মাদারীপুর) : মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার গোবিন্দপুরে অবস্থিত শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী সার্বজনীন রাজৈর কালীবাড়ি মন্দিরে দেবীর দানকৃত স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে সেই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা ধর্মীয় আস্থা ও দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার প্রশ্নে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই ভক্ত, সনাতনী সম্প্রদায় ও এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
অনুমোদনহীন বিক্রি, সুদের ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ : স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মন্দিরে দানকৃত দেবীর স্বর্ণালঙ্কার কোনো সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত, নির্বাচন বা প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বিক্রি করা হয়। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—বিক্রির অর্থ মন্দিরের উন্নয়ন বা ধর্মীয় কাজে ব্যয় না করে সুদের বিনিময়ে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী স্পষ্টতই অবৈধ।

অভিযোগকারীরা জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে মন্দির পরিচালনা কমিটি অগণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, এ সময়কালে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মন্দিরের কোনো বৈধ ব্যাংক হিসাবও নেই, ফলে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ।

দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের ভয়াবহ অভিযোগ : নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, রাজৈর কালীবাড়ির নামে থাকা নিষ্কর দেবোত্তর সম্পত্তির কিছু অংশ ইতোমধ্যেই অবৈধভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, দেবোত্তর সম্পত্তি কখনোই হস্তান্তরযোগ্য নয়—তবুও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বছরের পর বছর ধরে এসব সম্পত্তি দখল করে ভোগদখল করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উদাহরণ হিসেবে রাজৈর দিঘীরপাড়ের দয়াময়ী মন্দিরের ৫.৮ একর দেবোত্তর নিষ্কর সম্পত্তির কথা উল্লেখ করেন স্থানীয়রা, যেখানে বর্তমানে এক একর জমিও অবশিষ্ট নেই। অভিযোগ রয়েছে, রাজৈর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট শম্ভুনাথ পান্ডে নিজেই দেবোত্তর সম্পত্তি দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সচেতন মহলের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়—বরং পরিকল্পিতভাবে দেবোত্তর সম্পত্তি গ্রাসের ধারাবাহিক চিত্র।
সভাপতির স্বীকারোক্তি, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেল : মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি দ্বীজপদ মণ্ডল অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, “আমি মন্দিরের ৩ ভরি স্বর্ণ বিক্রি করেছি এবং সেই অর্থ সুদের বিনিময়ে বিনিয়োগ করেছি। কোনো অর্থ ব্যক্তিগতভাবে নেইনি।”
তবে তিনি কোনো সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক অনুমোদন কিংবা কমিটির বৈধতা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি, যা সন্দেহ আরও গভীর করেছে।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বলেন, “এধরনের জঘন্য ও অনৈতিক কাজের সাথে আমি জড়িত নই। আমাকে না জানিয়ে এ ধরনের কাজ ঘটে থাকতে পারে। তবে এর প্রতিবিধান দরকার।”
ভক্তদের ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভক্ত বলেন, “যিনি দীর্ঘদিন ধরে সভাপতি, তিনি কখনো মন্দিরে দান করেননি। এখন দেবীর দানকৃত সোনা বিক্রি করে সুদে লাগানোর অভিযোগ শুনে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত।”
আইন কী বলছে ? বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী এ ঘটনায় ৪০৬, ৪২০, ৪২৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় মামলা হতে পারে। এসব ধারায় ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা সর্বোচ্চ জীবন কারাদণ্ডেরও বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের আদালতের একাধিক রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— “দেবোত্তর সম্পত্তি কখনো বিক্রয়যোগ্য নয়। দেবতা একটি চিরস্থায়ী আইনগত সত্তা।”
সংগঠনগুলোর হুঁশিয়ারি : রাজৈর উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সদস্য সচিব সনজীব কুমার দাস বলেন, “দেবোত্তর সম্পত্তি কেউ আত্মসাৎ করে পার পাবে না। অচিরেই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য ফ্রন্টের রাজৈর উপজেলা শাখার এক নেতা বলেন, “সার্বজনীন মন্দিরের দানকৃত সম্পত্তি দেবোত্তর সম্পত্তি। অনুমতি ছাড়া বিক্রি বা সুদে বিনিয়োগ করা গুরুতর অপরাধ। প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।”
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা : এলাকাবাসী ও ভক্তরা অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত, দানকৃত স্বর্ণ ও অর্থের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ এবং অবৈধভাবে দখল হওয়া দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা—উপজেলা প্রশাসন ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরকে ঘিরে চলমান অগণতান্ত্রিকতা ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
