
নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক ছাত্রলীগ-যুবলীগ সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে এবার উঠে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। অবৈধ নিয়োগ, বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি, আদালতের আদেশ অমান্য এবং একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলনের মাধ্যমে শত কোটি টাকার দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম।

আদালতের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে নিয়োগ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের একটি গোষ্ঠী আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও সরাসরি উচ্চতর পদে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে অবৈধভাবে নিয়োগ পান। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী উচ্চতর পদে সরাসরি নিয়োগ হলে তা ব্লক পোস্ট হিসেবে বিবেচিত, যেখানে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ নেই। অথচ ষষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তারা বিধি ভেঙে পঞ্চম গ্রেডে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
দ্বৈত বেতন কেলেঙ্কারি — একই সময়ে দুই দপ্তর থেকে অর্থ উত্তোলন : সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো — মোঃ জাহাঙ্গীর আলম একই সময়ে বিআইডব্লিউটিএ থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে বেতন গ্রহণ করেছেন, আবার একই সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবেও এককালীন বেতন তুলেছেন। এ সংক্রান্ত বেতন উত্তোলনের নথির কপি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।


সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী একই সময়ে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে আজও বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম।

‘বদরুল আলম খানের ছত্রছায়ায়’ গড়ে ওঠা দুর্নীতির বলয় : গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা বদরুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে দরপত্র বাণিজ্যের অর্থ উত্তোলন ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বদরুল আলমের ডানহাত হিসেবে পরিচিত হওয়ায় বিভাগজুড়ে তার দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বিভাগের কর্মকর্তারা তার ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবৈধ পদোন্নতির নেটওয়ার্ক : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাবেক পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া ও রফিকুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও এ নিয়োগে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছিল।

আরও অভিযোগ, এই নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা শুধু রাজনৈতিক ক্যাডারই নন, বরং জুলাই আন্দোলনের বিপরীতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় অর্থদাতা হিসেবে নাম থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
আদালতের রায় অমান্য করে বিসিএস কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা হরণ : আদালতের নির্দেশে ১৭ জন বিসিএস কর্মকর্তার পদ সংরক্ষণের আদেশ থাকলেও গণপূর্ত অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় তা কার্যকর করেনি। বরং অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের বিসিএস কর্মকর্তাদের ওপরে জ্যেষ্ঠতা দেওয়া হয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর বিসিএস কর্মকর্তারা গ্রেডেশন চেয়ে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে আবেদন করলেও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শামীম আখতার বিষয়টি নিষ্ক্রিয়ভাবে ঝুলিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আদালতের আদেশের প্রকাশ্য অবমাননা এবং স্বৈরাচারী দোসরদের অবৈধ সুবিধা রক্ষার কৌশল।
প্রশাসনের ভেতরেও প্রশ্ন : জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই পদোন্নতি কোনোভাবেই বিধিসম্মত নয়। এর পেছনে শক্তিশালী প্রভাব না থাকলে এমন ঘটনা সম্ভব নয়।”

টিআইবি’র অভিমত — দুদকের জরুরি তদন্ত প্রয়োজন :ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা বলেন,“আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যে যোগদান এবং চাকরি না করেও বেতন উত্তোলন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ। দুদকের উচিত দ্রুত তদন্ত করে অর্থ ফেরত আনা এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা।”
প্রশ্ন থেকেই যায় : আদালতের আদেশ, সরকারি চাকরি বিধি এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা — সবকিছু উপেক্ষা করে কীভাবে এত বড় অনিয়ম বছরের পর বছর চলতে পারে? কোন ‘অদৃশ্য শক্তি’র বলয়ে আজও বহাল রয়েছে এই দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ? জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
