
বিশেষ প্রতিবেদক : মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যে সংগঠনটি এক সময় সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি করত, সেই ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আজ কার্যত একটি তালাবদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। মুখে ‘চেতনা’, পেটে ‘হালুয়া-রুটি’—এই দ্বৈত রাজনীতির পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ এখন ডিইউজে।

গত ১৫ বছর ধরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ঢাল বানিয়ে যারা গলা ফাটিয়েছেন : অভিযোগ রয়েছে—তারাই ক্ষমতার ছায়ায় বসে হালুয়া-রুটি চেটেপুটে খেয়েছেন, এমনকি যা মাটিতে পড়েছে তাও তুলতে দ্বিধা করেননি।
তিন হাজার সদস্যের সংগঠন বলে পরিচিত এই ‘আওয়ামী লীগের দোকান’-এর বাস্তব অবস্থা আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও একসঙ্গে দেখা যায় না। সংগঠন আছে, নেতৃত্ব নেই; ভবন আছে, ভেতরে প্রাণ নেই।

তিন হাজার সদস্য, বাস্তবে একশ’ও নয় : ভিতরের খবর বলছে, এই সংগঠনে এখন ১০০ জন প্রকৃত সদস্যও পাওয়া যাবে না। বড় বড় নেতা নিজেদের স্বার্থে যার যার মতো সদস্য বানিয়ে নিয়েছেন—উদ্দেশ্য একটাই: হালুয়া-রুটি লুট।

সাংবাদিকতা নয়, এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছিল সুবিধাভোগের হিসাব, কমিটির দখল, আর রাজনৈতিক আনুগত্যের দরকষাকষি।
পাঁচ আগস্টের পর তালাবদ্ধ অফিস, তালাবদ্ধ বিবেক :
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বাস্তবতা হলো—পাঁচ আগস্টের পর থেকে ডিইউজের অফিসে আজও তালা ঝুলছে। খুলবার সাহস তো দূরের কথা, বর্তমান কমিটির কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতেও রাজি নন। ফোন ধরেন না, বিবৃতি দেন না, সংগঠনের অস্তিত্ব যেন নিজেরাই অস্বীকার করছেন।
এক সময় যারা মঞ্চে উঠে নৈতিকতার লেকচার দিতেন, তারা আজ কচ্ছপের মতো মাথা গুটিয়ে নিজের নিজের সম্পদ আর নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যস্ত।
চেতনা বিক্রির বাজার ও অপ-সাংবাদিকতার উত্থান :
সমালোচকদের ভাষায়, গত দেড় দশকে ডিইউজে পরিণত হয়েছিল কিছু বাটপার, চান্দাবাজ, ধান্ধাবাজ ও অপেশাদার শৃগালদের আখড়ায়।
চেতনার ব্যানারে চলেছে অপ-সাংবাদিকতা, সৃষ্টি হয়েছে বিতর্কিত নেতৃত্ব, যেখানে সাংবাদিকতার নীতি নয়—প্রাধান্য পেয়েছে ব্যক্তিগত লাভ, রাজনৈতিক তোষামোদ আর সুবিধার রাজনীতি।
রাজনৈতিক শিক্ষা কী ? এই পতনের ভেতরে একটি বড় রাজনৈতিক শিক্ষা লুকিয়ে আছে : চেতনা যখন পেশা ঢাকার পর্দা হয়ে যায়, তখন সংগঠন থাকে—কিন্তু আদর্শ থাকে না। ডিইউজের বর্তমান নীরবতা আসলে শুধু একটি সংগঠনের ব্যর্থতা নয়; এটি সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষমতা গেলে দায় এড়াতে তালা ঝোলে, আর বিবেক হয় উধাও।
আজ ডিইউজে প্রশ্নের মুখে—সাংবাদিক সমাজের কাছেই নয়, ইতিহাসের কাছেও। কারণ চেতনা যদি সত্যিই আদর্শ হতো, তবে অফিসে তালা থাকত না, মুখে থাকত না ভয়, আর নেতৃত্ব এভাবে আত্মগোপনে যেত না। এই নীরবতাই এখন সবচেয়ে জোরালো স্বীকারোক্তি।
