
নিজস্ব প্রতিবেদক : এক-এগারোর সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তারের পেছনে দেশের প্রভাবশালী দুই সম্পাদক ও সুশীল সমাজের একটি অংশের চাপ ছিল বলে দাবি করেছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। রিমান্ডে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং গ্রেপ্তারের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহ ও তৎকালীন রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, সেনাবাহিনীর ভেতরে খালেদা জিয়া বা তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার নিয়ে দ্বিধা ছিল। কোর কমান্ড পর্যায়ে তাদের বিদেশে পাঠানো কিংবা গৃহবন্দি রাখার আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
মাসুদ উদ্দিন দাবি করেন, ২০০৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। এরই অংশ হিসেবে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম এক পর্যায়ে তার সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে গুলশানের একটি বাসভবনে আয়োজিত নৈশভোজে তিনি অংশ নেন। সেখানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, কয়েকজন বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানান।

তার দাবি, ওই বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক সংকট এবং সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। উপস্থিত কয়েকজন তাকে জানান, দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার জন্য বড় ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন। মাসুদ উদ্দিন বলেন, তিনি তখন স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে সেনাবাহিনী চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং এ ধরনের বিষয়ে সেনাপ্রধানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও দাবি করেন, পরে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার একাধিক বৈঠক হয়। সেখানে নির্বাচন, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
মাসুদ উদ্দিনের ভাষ্যমতে, সেনাবাহিনীর একটি অংশ জিয়া পরিবারকে গ্রেপ্তারের বিপক্ষে থাকলেও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তিনি গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করেছেন, মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মনে করতেন, দুই নেত্রীকে সরানো ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হওয়ায় জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ সেনাবাহিনীর মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে—এ আশঙ্কার কথাও তিনি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছিলেন। তবে তার দাবি, সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে তখন জনমত তৈরির তাগিদ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সংবাদপত্রে দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবেদন ও মতামত প্রকাশিত হতে থাকে।
জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, ২০০৫ সালের পর থেকে দেশের একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক পরিকল্পিতভাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে থাকে। একই সঙ্গে “যোগ্য প্রার্থী” ও “রাজনৈতিক সংস্কার” ইস্যুকে সামনে এনে বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠক ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি করা।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, এক-এগারোর পটভূমি ও এর নেপথ্যের ভূমিকা পুরোপুরি উদঘাটন করতে হলে তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে একাধিক মামলায় তাকে কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
