অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক নজরুল

Uncategorized ইতিহাস ঐতিহ্য জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বাংলাদেশের জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

 


বিজ্ঞাপন

মোঃ সাইফুর রশিদ চৌধুরী :  ​বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য ও চিরভাস্বর নাম। তিনি শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ নন, বরং মানবতার, সাম্যের এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মূর্ত প্রতীক। যখন তৎকালীন সমাজ ধর্মীয় সংকীর্ণতা, কুসংস্কার এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জর্জরিত ছিল, তখন নজরুল তাঁর লেখনীকে অস্ত্র করে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সব ধরনের বিভেদের বিরুদ্ধে। মানুষের চেয়ে বড় যে কিছু হতে পারে না—এই পরম সত্যটিই তিনি আজীবন তাঁর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে প্রচার করে গেছেন।

​নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল ভিত্তি ছিল মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের ঐতিহ্য, মিথ এবং সংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন ও ধারণ করেছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি কোনো কৃত্রিম বা রাজনৈতিক কৌশল ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর অন্তরের অন্তস্তল থেকে আসা এক সহজাত তাগিদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে মানুষের ভেতরের মানবিক মূল্যবোধ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


বিজ্ঞাপন

​নজরুলের সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধে এই অসাম্প্রদায়িক সুর তীব্রভাবে অনুরণিত হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি চরম সত্যটি উচ্চারণ করেছেন—


বিজ্ঞাপন

​”গাহি সাম্যের গান—মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!” এই কবিতাতেই তিনি মোল্লা-পুরোহিতদের সংকীর্ণতার তীব্র সমালোচনা করে উপাসনালয়ের চেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের অন্নসংস্থানকে বড় করে দেখিয়েছেন। আবার তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যেমন এসেছে ‘ভগবান-বুকে পদ-চিহ্ন’ বা ‘পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল’, তেমনই এসেছে ‘আরশ’, ‘ইস্রাফিল’ বা ‘জেহাদ’। দুই ধর্মের রূপক ও উপমাকে তিনি একই সুতোয় গেঁথেছেন। শুধু তাই নয়, নজরুল একাধারে রচনা করেছেন ইসলামী গজল ও হামদ-নাত, আবার অন্যদিকে সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও ভজন। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এই দুই ধারায় সমানভাবে সফল হওয়া কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব ছিল।

​নজরুল সবসময় ভারত উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ শক্তির ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ের ঐক্য ছাড়া দেশের মুক্তি অসম্ভব। তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকায় তিনি বারবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ডাক দিয়েছেন। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রশ্ন তুলেছেন:

​”‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন ? কাণ্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।” নজরুলের কাছে সংকটের সময়ে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় বড় ছিল না, মানুষ বিপন্ন—এটাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সত্য।

​নজরুল কেবল লেখার টেবিলেই অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল এই চেতনার এক বাস্তব প্রতিফলন। তিনি প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁদের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ। ধর্মীয় বা সামাজিক কোনো বাধাই তাঁর এই উদার জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারেনি।

​বর্তমান বিশ্বেও যখন ধর্মের নামে হানাহানি, বিদ্বেষ আর বিভেদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তখন নজরুল আমাদের চেতনায় এক অফুরন্ত আলোর উৎস। নজরুল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে বন্দি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সার্বজনীন, চিরকালের মানুষের কবি। অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন এবং মানবিক একটি সমাজ গঠনে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য আজও আমাদের প্রেরণার উৎস।

👁️ 27 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *