
আজকের দেশ ডটকম ডেস্ক : টেলিভিশনের ঝলমলে পর্দা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ – দর্শকের চোখে সবই যেন এক আলোকিত জগতের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সেই আলোর নিচেই যদি জমে থাকে নিকষ অন্ধকার? যদি ক্যামেরার পেছনের করিডোরে গড়ে ওঠে ভয়, প্রভাব আর অনৈতিকতার এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য?

ঠিক এমনই এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের সদস্য সাবেক নির্বাহী প্রযোজক শাফায়েত হোসাইন। অভ্যন্তরীণ তদন্তে দোষী প্রমাণিত হয়ে অবশেষে চাকরি হারিয়েছেন তিনি। তবে এই পতনের পেছনে উঠে এসেছে ভয়ংকর সব অভিযোগ, যা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনকে।
ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর উপজেলার চর খোয়াজপুর গ্রামের খামারী মাহাবুব হোসেনের ছেলে শাফায়েত হোসাইন বর্তমানে রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী ও স্কুলগামী দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। বাহ্যিকভাবে পরিপাটি, মার্জিত ও পেশাদার পরিচয়ের আড়ালে সহকর্মীদের ভাষ্যমতে, লুকিয়ে ছিল এক ভিন্ন চরিত্র – যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী সহকর্মীদের প্রতি অনৈতিক আগ্রহ এবং মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়ে ছিল।

বিষাক্ত কর্মপরিবেশ: মুখ খুললেই ‘আউট’ : অভিযোগ রয়েছে, ডিবিসির নিউজরুমে নিজের অবস্থানকে পুঁজি করে শাফায়েত হোসাইন এমন এক প্রভাব বলয় তৈরি করেছিলেন, যেখানে তিনিই ঠিক করতেন কার ক্যারিয়ার সামনে এগোবে আর কার পথ থেমে যাবে।

বিশেষ করে নতুন ও আকর্ষণীয় নারী উপস্থাপিকাদের লক্ষ্য করে শুরু হতো তার ‘মেন্টাল গেম’। প্রথমে ভালো শিডিউল, জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, বিশেষ টকশো কিংবা বাড়তি স্ক্রিন-টাইমের প্রলোভন দেখিয়ে তৈরি করা হতো সখ্যতা। এরপরই শুরু হতো ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার চাপ এবং অস্বস্তিকর ইঙ্গিত।
একাধিক সূত্রের দাবি, তার অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া না দিলেই শুরু হতো মানসিক নির্যাতন। তুচ্ছ ভুলকে বড় করে দেখা, অকারণে নতুন নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া, অপমানজনক আচরণ এবং ধীরে ধীরে পর্দা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল ছিল নিয়মিত ঘটনা।
গত মাসেই এমন ‘টক্সিক’ পরিবেশের শিকার হয়ে ডিবিসি ছেড়েছেন একাধিক নারী উপস্থাপিকা।
প্রভাবের ছায়া ও অর্থ আত্মসাৎ : শাফায়েতের এত ক্ষমতার উৎস কোথায় – এ প্রশ্ন ডিবিসির ভেতর-বাইরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জানা গেছে, পরিচালনা বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন নিজের অপকর্ম আড়াল করে আসছিলেন তিনি। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি শুধু নারী সহকর্মীদের নয়, পুরুষ সহকর্মীদের ক্যারিয়ার নিয়েও ছিনিমিনি খেলতেন।
ডিবিসির সাবেক স্পোর্টস ইনচার্জ তাইয়েব অনন্তকে চাকরিচ্যুত করার নেপথ্যেও শাফায়েতের কৌশলী ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক নারী উপস্থাপিকাকে কৌশলে ব্যবহার করে তাইয়েব অনন্তের বিরুদ্ধে সাজানো অভিযোগ দায়ের করানো হয়, যার সাক্ষী ছিলেন শাফায়েত নিজেই। এমনকি সেই অভিযোগ পুরোটাই লিখে দেয় শাফায়েত হোসাইন। ঐ উপস্থাপিকা তাতে স্বাক্ষর করে। কোনো ধরনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই ডিবিসি থেকে চাকরি হারাতে হয় তাইয়েব অনন্তকে।
অতীতের বিতর্ক : শাফায়েত হোসেনের অতীতও বিতর্কে ঘেরা। জনপ্রিয় উপস্থাপিকা মৌসুমী মৌ-এর একটি স্পোর্টস শো-এর অর্থ দেড় লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ডিবিসি থেকে চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। পরে দেশ টিভিতে যোগ দিলেও স্বভাব বদলাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে একাউন্টস বিভাগের এক সাবেক সহকর্মী সুপারিশে আবারও ডিবিসিতে ফিরে আসেন তিনি। আর ফিরে এসেই শুরু করেন পুরনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি।
নেতার ছবি ও ‘জুজুর ভয়’ : সহকর্মীদের কাছে নিজের প্রভাব বিস্তারের আরেকটি হাতিয়ার ছিল রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত। মিরপুরের এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে অফিসে এক ধরনের ‘জুজুর ভয়’ তৈরি করে রাখতেন তিনি। কথায় কথায় সেই প্রভাবের দাপট দেখিয়ে সহকর্মীদের চুপ করিয়ে রাখতেন। সহকর্মীদের ভাষায়, “তিনি যেন একজন প্রযোজক নন, বরং এক মূর্তিমান আতঙ্ক।”
ফাঁস হওয়া গোপন কথোপকথনে উন্মোচিত মুখোশ : সম্প্রতি এক নারী উপস্থাপিকার সঙ্গে শাফায়েতের গোপন কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। ডিবিসির মহাখালীর প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

সেই কথোপকথনে উঠে আসে, সাবেক উপস্থাপিকা তানিয়া হারুন চ্যানেল ওয়ানে যোগ দেওয়ার পর ‘প্রযত্নে বাংলাদেশ’-এর জন্য নতুন উপস্থাপিকা বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় শাফায়েত নিজের পছন্দের প্রার্থীকে সুযোগ পাইয়ে দিতে পরিচালক রুশায়েদ আহসানকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। সংবাদ বিভাগের রিপোর্টারদের বাদ দিয়ে আরটিভি থেকে সদ্য যোগ দেওয়া এক উপস্থাপিকাকে সেখানে বসানোর পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। শাফায়েত হোসেন ও রুশায়েদ আহসানের সেই কথোপথন রয়েছে আমাদের কাছে।
একই কথোপকথনে উঠে আসে আরো দুই প্রযোজকের নারীঘটিত প্রসঙ্গ, এমনকি এক সাবেক সচিবের নামও আলোচনায় আসে।
তদন্তে দোষী, পদত্যাগের নির্দেশ : গোপন তথ্য ফাঁসের পর ডিবিসি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নেয়। শাফায়েত হোসেনের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয় এবং গঠন করা হয় চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ডিবিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়। অবশেষে চাকরিচ্যুত হন শাফায়েত।
চাকরি হারিয়েও থামেননি : চাকরি হারানোর পরও থেমে নেই তার তৎপরতা। সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে চ্যানেল ওয়ানসহ দেশের একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে নতুনভাবে যোগ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন তিনি। একই সাথে পুনরায় ডিবিসিতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রতিদিনই তাকে দেখা যাচ্ছে ডিবিসি অফিসের আশেপাশে।
