একটি সিভি, একটি সুপারিশপত্র এবং ক্ষমতার নির্মম রাজনীতি

Uncategorized জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন রাজনীতি

জেমস আব্দুর রহিম রানা  :  একজন আঠারো বছরের মেয়ে। হাতে একটি সিভি। চোখে একটি চাকরির স্বপ্ন। এই দৃশ্য বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। প্রতিদিন হাজারো তরুণ-তরুণী একটি চাকরির আশায় শহর থেকে শহরে, অফিস থেকে অফিসে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু তাদের সবার গল্প এক নয়।


বিজ্ঞাপন

কেউ চাকরি খোঁজে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য, আবার কেউ চাকরি খোঁজে সংসার বাঁচানোর জন্য। যে মেয়েটির সিভি নিয়ে আজ এত আলোচনা, তার গল্প সম্ভবত দ্বিতীয় ধরনের। এসএসসি পাস করার পরপরই চাকরির খোঁজে নামতে হয়েছে তাকে। এর অর্থ হলো জীবন তাকে অপেক্ষা করার সময় দেয়নি। সংসারের প্রয়োজন তার স্বপ্নের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হয়তো ঘরে অসুস্থ মা আছেন। হয়তো ছোট ভাইয়ের স্কুলের বেতন বাকি পড়ে আছে। হয়তো ঝড়ের রাতে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে। হয়তো প্রতিদিনের বাজারের হিসাব মিলাতে গিয়ে পরিবারের মানুষগুলো নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একটি চাকরি তখন আর শুধু চাকরি থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার লড়াই।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ দারিদ্র্য নয়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ হলো—একজন নাগরিককে তার ন্যায্য সুযোগ পাওয়ার জন্য ক্ষমতাবান মানুষের দরজায় যেতে হয়।
এখানেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা শুরু হয়।


বিজ্ঞাপন

কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে চাকরি পাওয়ার পথ হওয়ার কথা মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনও এমন একটি সংস্কৃতি টিকে আছে, যেখানে অনেক মানুষ বিশ্বাস করে—যোগ্যতা যথেষ্ট নয়, সঙ্গে একটি সুপারিশও দরকার।
আর সুপারিশের এই সংস্কৃতিই ক্ষমতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ।
যেখানে অধিকার অনুগ্রহে পরিণত হয়, সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নাগরিক থেকে প্রার্থী হয়ে যায়। আর ক্ষমতাবান ব্যক্তি জনপ্রতিনিধি থেকে সুযোগের রক্ষক হয়ে ওঠেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অভিযোগের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এবং সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে তার বহিষ্কারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। কিন্তু একজন ব্যক্তির পতন দিয়ে কি সমস্যার সমাধান হয়? আমি মনে করি না।

কারণ এখানে আসল প্রশ্ন ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থা। আজ একজন এমপিকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কাল অন্য কোনো দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, আমলা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ঘিরেও একই ধরনের অভিযোগ উঠতে পারে। কারণ সমস্যার শিকড় আরও গভীরে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনও এমন একটি ধারণা প্রবল যে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানেই সুযোগের কাছাকাছি থাকা। ফলে সাধারণ মানুষ চাকরি, বদলি, চিকিৎসা, ভাতা, অনুদান কিংবা অন্য যেকোনো প্রয়োজনের জন্য রাজনৈতিক প্রভাব খোঁজে।
এটি শুধু দুর্নীতির প্রশ্ন নয়; এটি মর্যাদার প্রশ্ন।

কারণ একজন নাগরিক যখন তার অধিকার পাওয়ার জন্য কারও ব্যক্তিগত সুপারিশের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়, তখন রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। সে আর অধিকারভোগী থাকে না; সে হয়ে যায় করুণাপ্রার্থী।

প্রতিটি নির্বাচনের আগে আমরা শুনি সুশাসনের কথা। শুনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা। শুনি সমতার কথা। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার দরজাগুলো আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়।
সরকার বদলায়। দল বদলায়। স্লোগান বদলায়।
কিন্তু সুপারিশের সংস্কৃতি বদলায় না।

কেন বদলায় না?  কারণ এই সংস্কৃতি অনেকের জন্য রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার একটি কার্যকর উপায়। যে মানুষটি চাকরির জন্য, চিকিৎসার জন্য কিংবা একটি ছোট সুযোগের জন্য ক্ষমতাবানের কাছে যেতে বাধ্য হয়, সে অজান্তেই একটি নির্ভরশীল সমাজব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।

আর নির্ভরশীল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। এই কারণেই আজকের ঘটনাটি কোনো একক কেলেঙ্কারির গল্প নয়। এটি ক্ষমতা, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতার গল্প।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে একজন আঠারো বছরের মেয়ের হাতে থাকা সিভি তার যোগ্যতার পরিচয় বহন করবে, তার অসহায়ত্বের নয়। তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে পরীক্ষা ও দক্ষতা, কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই নাগরিকের হয়, তাহলে একজন দরিদ্র মেয়েকে চাকরির আশায় কোনো ক্ষমতাবানের দরজায় দাঁড়াতে হবে না। তার সিভিই হবে তার পরিচয়, তার মেধাই হবে তার সুপারিশ।
যেদিন আমরা সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, সেদিন হয়তো এমন বিতর্ক আর জন্ম নেবে না।

কিন্তু ততদিন পর্যন্ত প্রতিটি আলোচিত সিভি আমাদের সামনে একই প্রশ্ন রেখে যাবে— আমরা কি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ছি, নাকি এখনও সুপারিশনির্ভর সমাজকে টিকিয়ে রাখছি?  (লেখক  : জেমস আব্দুর রহিম রানা, সিনিয়র সাংবাদিক, সাহিত্য গবেষক ও কলামিস্ট)

👁️ 16 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *