গণপূর্তের ‘উজির’: ক্ষমতার বলয়, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ : তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ; মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক : ফার্সি শব্দ ‘উজির’ অর্থ উচ্চপদস্থ মন্ত্রী বা উপদেষ্টা। আব্বাসীয় খিলাফতের শাসনামলে এ উপাধির প্রচলন শুরু হলেও আধুনিক বাংলাদেশে ‘উজির’ বলতে সাধারণত একটি ব্যক্তিনামই বোঝায়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলীকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠা নানা অভিযোগের কারণে তার নামটিও যেন ভিন্ন এক অর্থে আলোচিত হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রকৌশলী-ঠিকাদারদের একটি শক্তিশালী বলয়ের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন উজির আলী। তার বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাইয়ের দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

১৭ বছরে ঢাকার বাইরে মাত্র চার মাস ?  গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৭ বছরের সময়ে উজির আলী মাত্র প্রায় চার মাস ঢাকার বাইরে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণ (মেইনটেন্যান্স) জোনের দায়িত্বে রয়েছেন বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।


বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে একই কর্মকর্তার অবস্থান কীভাবে সম্ভব হলো এবং এর পেছনে কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


বিজ্ঞাপন

আজিমপুরে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় প্রশ্ন : ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল রাজধানীর আজিমপুরে জাজেস কমপ্লেক্সে গভীর রাতে নির্মাণকাজ চলাকালে ১০ তলা থেকে পড়ে এক শ্রমিক নিহত হন। সে সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে ছিলেন উজির আলী।

অভিযোগ ওঠে, নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও উত্থাপিত হয়।

ওই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল নুরানী কনস্ট্রাকশন। সূত্রগুলোর দাবি, একই সময়ে আজিমপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকটি কাজ চলছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে উজির আলীর কথিত কমিশন লেনদেন নিয়ে গণপূর্তের অভ্যন্তরে আলোচনা ছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি।

আজিমপুর কলোনির টেন্ডার নিয়েও প্রশ্ন : আজিমপুর কলোনির ২০ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ বণ্টন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দুটি ভবনের কাজ কুশলী নির্মাতা, তিনটি ভবনের কাজ মাসুদ অ্যান্ড কোং এবং চারটি ভবনের কাজ হাসান অ্যান্ড সন্সকে দেওয়া হয়।

এই বণ্টন প্রক্রিয়ায় দরপত্র মূল্যায়ন, যোগ্যতা নির্ধারণ এবং কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব বা অনিয়ম হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগকারীদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগে উজির আলী একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি বলয় তৈরি করেছিলেন। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কেরানীগঞ্জ কারাগার প্রকল্পেও তার নাম : কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সূত্রের দাবি, ওই প্রকল্পে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেছিলেন উজির আলী। প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে একটি গোপন তদন্ত কমিটির নথিতে ৩৭ কর্মকর্তার নাম থাকার কথাও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে ওই তালিকায় কার বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ ছিল, তদন্তের ফল কী হয়েছিল এবং উজির আলীর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

জি কে শামিমকে অতিরিক্ত বিল: তদন্ত কমিটিতে উজির আলী : ২০২১ সালে আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামিমকে কাজের অতিরিক্ত বিল পরিশোধের ঘটনা তদন্তের দায়িত্বেও উজির আলী ছিলেন বলে জানা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনায় জড়িত প্রকৌশলী ফজলুল হক মধুকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে লঘু শাস্তির মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে উজির আলী ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে উজির আলীর পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত কমিটির দায়িত্ব ছিল অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ কীভাবে ফেরত আনা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা দেওয়া। কারা দায়ী বা কাকে শাস্তি দেওয়া হবে—সেটি নির্ধারণ করা ওই কমিটির দায়িত্ব ছিল না।

এলটিএমের বদলে ওটিএম: কমিশনের অভিযোগ : ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের ১০০ শতাংশ বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা বা এপিপির কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে উজির আলীর বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থি ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল এবং এর বিনিময়ে কমিশন লেনদেন হয়েছে।
তবে অভিযোগটির পক্ষে কোনো প্রকাশ্য তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে সিদ্ধান্তটি বিধি অনুযায়ী হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট দরপত্রে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বজায় ছিল কি না এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

শত শত কোটি টাকার সম্পদ’—কোথা থেকে এলো ? উজির আলীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বিপুল সম্পদ অর্জন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, তার নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডে তার একটি ছয়তলা বাড়ি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি ব্লকে একটি ফ্ল্যাট, ধানমন্ডিতে প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং গাজীপুরে তার স্ত্রীর নামে প্রায় পাঁচ একর জমি রয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, কোম্পানি বা ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস অনুসন্ধান জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, উজির আলী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এমনকি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে। জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত কোনো মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা আসামি হওয়ার বিষয়টি সত্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—যদি তার বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা বা তদন্ত থেকে থাকে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে তার বর্তমান অবস্থান কীভাবে বহাল রয়েছে?

অভিযোগ অস্বীকার উজির আলীর : তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে উজির আলী বলেন, তিনি কখনো বাড়তি কোনো ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। দপ্তর থেকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি সেটিই পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

জানা গেছে, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তিনি যেসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভবিষ্যতে তিনি নতুন কোনো তথ্য বা বক্তব্য দিলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

এখন নজর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দিকে :  উজির আলীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের অংশ—তা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিশেষ করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি এখন এই অভিযোগগুলোর দিকে পড়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তার দীর্ঘ ১৭ বছরের পোস্টিং ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, দরপত্র অনুমোদন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত নথি, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে আজিমপুরের শ্রমিক নিহতের ঘটনা, কেরানীগঞ্জ কারাগার প্রকল্প, জি কে শামিমকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের তদন্ত, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এলটিএম-ওটিএম পদ্ধতি পরিবর্তন এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কথিত যোগাযোগ—এসব বিষয় পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে।

প্রশ্ন এখন একটাই : একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, দায়িত্বে অবহেলা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের মতো এতগুলো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে অভিযোগগুলো যাচাই না করে তাকে বহাল রাখা হবে, নাকি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করা হবে ?

গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—সেটিই সংশ্লিষ্ট মহলের মূল প্রশ্ন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে উজির আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়মুক্ত করার পথও তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হতে পারে। তাই প্রশ্নটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি অর্থ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতাকে ঘিরে।

👁️ 21 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *