নন্দীপাড়ার ৪১ শতাংশ জমি নিয়ে তোলপাড়  :  ১৯৬০-এর ক্রয়দলিলের পর ১৯৭১-এর বিক্রয়দলিল! নামজারি, মিস আপিল ও রিভিশন ঘিরে তুমুল বিরোধ

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  রাজধানীর নন্দীপাড়া মৌজার সিএস দাগ নম্বর ৭৬৯-এর ৪১ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে জটিল আকার ধারণ করেছে। ১৯৬০ সালের একটি বৈধ ক্রয়দলিল ও পরবর্তী ওয়ারিশসূত্রে মালিকানা এবং দখলের দাবি একদিকে; অন্যদিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সম্পাদিত ৭৬৮১ নম্বর একটি দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবির অভিযোগ—দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবিতে জমিটির মালিকানা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।


বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী রাম আনন্দ মন্ডলের অভিযোগ, ১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জমি তার পিতা রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডল ক্রয় করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশসূত্রে তিনি জমিটির মালিকানা লাভ করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর ১৯৭১ সালের ৭৬৮১ নম্বর দলিলের ভিত্তিতে আলহাজ্ব গ্রুপের মালিক আব্দুল আলী গং একই জমির ওপর মালিকানা দাবি করছেন বলে অভিযোগ তার।

বিরোধটি এখন শুধু জমির দখল বা মালিকানার দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নামে নামজারি, সেটি চ্যালেঞ্জ করে মিস কেস, পরবর্তী নামজারি, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের মিস আপিল, ভূমি আপিল বোর্ডে রিভিশন এবং বিচারাধীন অবস্থায় নামজারি বাতিলের কথিত তৎপরতা—সব মিলিয়ে নন্দীপাড়ার এই জমি নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে।


বিজ্ঞাপন

১৯৬০ সালের দলিলেই কি মালিকানা হস্তান্তর ? ভুক্তভোগী পক্ষের নথিপত্র ও বক্তব্য অনুযায়ী, আরএস রেকর্ডীয় মালিক নীরদ বালা দাস ১৯৬০ সালের ১৮ জুলাই ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ৪১ শতাংশ জমি শ্রী রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডলের কাছে বিক্রি করেন।


বিজ্ঞাপন

রাম আনন্দ মন্ডলের দাবি, পরবর্তীতে রূপচাঁদ মন্ডল ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র হিসেবে তিনি ওয়ারিশসূত্রে ওই জমির মালিকানা লাভ করেন। দীর্ঘদিন ধরে জমিটির ওপর তার মালিকানা ও দখলের দাবিও রয়েছে বলে তিনি জানান। কিন্তু পরবর্তী ভূমি রেকর্ড ও মালিকানা দাবিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা।

ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নামে নামজারি, পরে কর্তন  :  রাম আনন্দ মন্ডল নামজারির উদ্যোগ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট জমি ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নামে নামজারি করা হয়েছে। এরপর তিনি ২৪/২৫ মিস কেসের মাধ্যমে ওই নামজারি চ্যালেঞ্জ করেন।
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নামজারি কর্তন করে রাম আনন্দ মন্ডলের নামে ১২৬৯১ (IX-I), ২০২৫-২০২৬ নম্বর নামজারি গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ সম্পন্ন হয়।

তবে এই নামজারিই এখন বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কারণ, পরবর্তী সময়ে ওই নামজারি বাতিলের জন্য প্রশাসনিকভাবে তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রাম আনন্দ মন্ডল।

১৯৭১ সালের ৭৬৮১ নম্বর দলিল ঘিরে বিস্ফোরক প্রশ্ন ?  
বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি উঠে এসেছে ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখের ৭৬৮১ নম্বর দলিলকে কেন্দ্র করে।
রাম আনন্দ মন্ডলের পক্ষের দাবি, আলহাজ্ব গ্রুপের মালিক আব্দুল আলী গং এই দলিলের ভিত্তিতে একই ৪১ শতাংশ জমির ওপর মালিকানা দাবি করছেন।

এখানেই ভুক্তভোগী পক্ষের সরাসরি প্রশ্ন—১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে নীরদ বালা দাস যদি ওই জমি রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডলের কাছে বিক্রি করে থাকেন, তাহলে তাদের ভাই লেবুচান মন্ডলের ওই জমি বিক্রির আইনগত অধিকার কীভাবে সৃষ্টি হলো?

ভুক্তভোগী পক্ষের আরও দাবি, স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও তৎকালীন সময়ের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী লেবুচান মন্ডল ওই জমি বিক্রি করেননি এবং কারও সঙ্গে বায়নাপত্রও করেননি।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ১৯৬০ ও ১৯৭১ সালের মূল দলিল, সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড, দলিলের সাক্ষী, খতিয়ান এবং অন্যান্য ভূমি নথি যাচাই করা জরুরি।

President’s Order No. 12 of 1972—প্রশ্ন উঠছে এখানেও  :  ১৯৭১-৭২ সময়কালে সম্পাদিত কিছু দলিলের আইনগত কার্যকারিতা নিয়েও ভুক্তভোগী পক্ষ প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, পরবর্তী সময়ে President’s Order No. 12 of 1972-এর আলোকে নির্দিষ্ট কিছু দলিলের আইনগত অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

তবে ৭৬৮১ নম্বর দলিলটি ওই আদেশের আওতাভুক্ত কি না, আর আওতাভুক্ত হলে তার সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রভাব কী—তা কেবল সংশ্লিষ্ট নথি, সরকারি রেকর্ড ও আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। ফলে এ ক্ষেত্রে অনুমান নয়, প্রয়োজন মূল দলিল ও প্রাসঙ্গিক আইনগত নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাই।

শুনানির আগেই আদেশ—মিস আপিল ঘিরে প্রশ্ন : অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), ঢাকার মিস আপিল নং ৪৩৮/২০২৪ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ভুক্তভোগী পক্ষ। তাদের দাবি, মামলার শুনানির তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্ধারিত থাকার কথা থাকলেও তার আগে ১৭ আগস্ট ২০২৬ একটি আদেশ দেওয়া হয়েছে।

রাম আনন্দ মন্ডলের পক্ষের আরও অভিযোগ, প্রকৃত দাবিদার হিসেবে তাকে যথাযথভাবে পক্ষভুক্ত না করেই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার নামে সম্পন্ন নামজারি বাতিলের জন্য ভূমি অফিস এবং ডেমরা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

এ ঘটনায় রাম আনন্দ মন্ডল ভূমি আপিল বোর্ড, ঢাকায় রিভিশন মামলা নং ৩-২১১/২০২৬ দায়ের করেছেন বলে দাবি করেছেন।
বিচারাধীন অবস্থায় নামজারি বাতিলের তৎপরতার অভিযোগ
রাম আনন্দ মন্ডলের অভিযোগ, আপিল ও রিভিশন প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও তার নামে সম্পন্ন নামজারি বাতিলের জন্য বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

তার আরও অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে ডেমরা সার্কেলের এসিল্যান্ডকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজেশ-তপনের দাবিতেও প্রশ্ন  :  বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাজেশ দাশ ও তপন কুমার দাসের মালিকানা দাবি। অভিযোগ রয়েছে, তারা নিজেদের নীরদ বরন দাসের পুত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওই জমির ওপর মালিকানা দাবি করেছেন।
এ ক্ষেত্রেও রাম আনন্দ মন্ডল পক্ষের প্রশ্ন—নীরদ বরন দাস যদি ১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমি রূপচাঁদ ও গোপিচাঁদ মন্ডলের কাছে বিক্রি করে থাকেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে তার উত্তরাধিকারীরা একই জমির ওপর কীভাবে মালিকানা দাবি করছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বিক্রয়দলিল, খতিয়ান, নামজারি, উত্তরাধিকার সনদ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ভূমি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

দখল ও ভয়ভীতির অভিযোগ  :  রাম আনন্দ মন্ডল আরও অভিযোগ করেছেন, আব্দুল আলী গংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রফিকুল ইসলাম, মুরাদ গংসহ কয়েকজন তার জমি দখল এবং নামজারি বাতিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তিনি।

এখন মূল প্রশ্ন নথি নিয়ে  :  নন্দীপাড়া মৌজার সিএস দাগ নম্বর ৭৬৯-এর ৪১ শতাংশ জমির বিরোধে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একাধিক নথি ও মামলার ধারাবাহিকতা।

এর মধ্যে রয়েছে—১৯৬০ সালের ১৮ জুলাইয়ের ৯২৯২ নম্বর ক্রয়দলিল, ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের ৭৬৮১ নম্বর দলিল, সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও নামজারি রেকর্ড, ২৪/২৫ মিস কেস, মিস আপিল নং ৪৩৮/২০২৪ এবং ভূমি আপিল বোর্ডের রিভিশন মামলা নং ৩-২১১/২০২৬।

প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে কোনো পক্ষের প্রভাব, অর্থবল কিংবা ভয়ভীতি নয়—নিবন্ধিত দলিল, সরকারি ভূমি রেকর্ড, উত্তরাধিকারসূত্র, বৈধ দখল এবং আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনসম্মত সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত চূড়ান্ত ভিত্তি।

বিশেষ করে বিরোধটি যখন আপিল ও রিভিশন পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো আদালত ও উচ্চতর কর্তৃপক্ষের আদেশের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া।

একই সঙ্গে কোনো পক্ষ যাতে প্রভাব খাটিয়ে জমির দখল পরিবর্তন, নামজারি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী রাম আনন্দ মন্ডল।

নন্দীপাড়ার এই ৪১ শতাংশ জমির ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কোন দলিল বৈধ, কার নামে প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত এবং কোন নামজারি আইনসম্মত—তার উত্তর মিলবে নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাই ও আইনগত সিদ্ধান্তেই। তাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি একটাই—প্রভাব নয়, ১৯৬০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত জমিটির সব নথির নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ পর্যালোচনা।

👁️ 32 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *