
নিজস্ব প্রতিবেদক : গত ২৪ জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতিতে যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে, তা স্বাধীনতার পর বিরল। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রভাব ও রাজনৈতিক আপসের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখন নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সম্মতি: কী বদলাতে পারে ? বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র নীতিগতভাবে জ্যাভেলিন অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল (ATGM) ও UH-60L ব্ল্যাক হক মিডিয়াম লিফট হেলিকপ্টার সরবরাহে সম্মতির ইঙ্গিত দিয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ বাহিনীর জন্য কিছু উন্নত ও শ্রেণিবদ্ধ সরঞ্জাম নিয়েও প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা এগিয়েছে।
এগুলো বাস্তবায়িত হলে— অ্যান্টি-আর্মার সক্ষমতায় গুণগত লাফ আসবে। ফায়ার-অ্যান্ড-ফরগেট প্রযুক্তির জ্যাভেলিন আধুনিক ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান প্রতিহত করতে কার্যকর, বিশেষ করে পাহাড়ি ও জঙ্গলভিত্তিক পরিবেশে। মোবিলিটি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাড়াবে ব্ল্যাক হক। ট্রুপ ট্রান্সপোর্ট, মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন, বিশেষ অভিযান, দুর্যোগকালীন উদ্ধার ও লজিস্টিক সাপোর্ট—সবখানেই এর প্রমাণিত সক্ষমতা আছে, রাত ও প্রতিকূল আবহাওয়াতেও।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ ? সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও আঞ্চলিক চাপ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ফলাফল—স্বাধীনতার ভাষ্য থাকলেও আত্মরক্ষার কাঠামো ছিল দুর্বল।

সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এখন দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিবেচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষায়, “এই সক্ষমতা বৃদ্ধি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; এটি নিজের আকাশ, স্থল ও জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অধিকার।” তবে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ যখন আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে হাঁটে, তখন আঞ্চলিক দাদাগিরির জায়গা সংকুচিত হয়।
“কুশীলব’ বনাম জাতীয় স্বার্থ : একাধিক সাবেক সামরিক ও কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, অতীতে কিছু রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী ক্ষমতার হিসাবকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিরক্ষা স্বার্থকে গৌণ করেছে। সেই ধারার ভাঙনই এখন চোখে পড়ছে। ২৪ জুলাইয়ের আন্দোলন এই পরিবর্তনের সামাজিক ম্যান্ডেট তৈরি করেছে—এমন মতও আছে।
সামনে চ্যালেঞ্জ কী ? নীতিগত সম্মতি মানেই চুক্তি নয়। সামনে আছে— স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, সংসদীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি, কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে জনগণের স্বার্থকে এক নম্বরে রাখা।
উপসংহার : বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতায় সম্ভাব্য এই সংযোজন গোলামির মানসিকতা ভাঙার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে—যদি তা হয় স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে। স্বাধীনতা কেবল ইতিহাস নয়; স্বাধীনতা প্রতিদিনের প্রস্তুতি।
