
বিশেষ প্রতিবেদক : জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল নিপীড়ন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনগণের এক ঐতিহাসিক জাগরণ।

সেই অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল—দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয়, অপরাধীদের সঙ্গে আপস নয়, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই দায়মুক্তি—এই সংস্কৃতির অবসান কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই চেতনা কি আজও অটুট?
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু : একই মঞ্চে প্রধান উপদেষ্টা ও অভিযুক্ত জহিরুল ইসলাম : সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানে হত্যাচেষ্টা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং সিন্ডিকেটেডভাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অর্থ পাচারের ঘটনায় তদন্তাধীন অভিযুক্ত জহিরুল ইসলাম। এই উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।

‘ম্যানেজ’-এর চেষ্টা, আর তার পরিণতি : প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভিন্ন মাধ্যমে জহিরুল ইসলাম নিজে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ শুভানুধ্যায়ীদের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। বার্তা ছিল একটাই— “কোনোভাবে কি বিষয়টি ম্যানেজ করা যায় ?” এখানেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবাদিকতার সঙ্গে পুরোনো ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়। এই প্রতিবেদন ম্যানেজযোগ্য নন। বরং, ‘ম্যানেজ’-এর প্রস্তাব এলেই অনুসন্ধান আরও গভীর হয়।

অনুসন্ধানে যা বেরিয়ে এলো : অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী— সিঙ্গাপুরে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা, জহিরুল ইসলাম ও তাঁর ভাই মাযহারুল ইসলাম সিঙ্গাপুরে “Starsid Technologies” নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। সিঙ্গাপুরের Accounting and Corporate Regulatory Authority (ACRA)–এর নথিতে ওই প্রতিষ্ঠানের Paid-up Capital দেখানো হয়েছে ৬ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার।
নাগরিকত্বের বিস্ময়কর তথ্য : ACRA–এর তথ্যানুযায়ী, জহিরুল ইসলাম ও মাযহারুল ইসলাম—উভয়েই তুরস্কের নাগরিক।তাঁদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যও পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান কী বলছে ? বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে— জহিরুল ইসলাম কিংবা মাযহারুল ইসলামকে সিঙ্গাপুরে কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তুরস্কে নাগরিকত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিদেশে অর্থ পাঠানোর কোনো বৈধ সুযোগও দেওয়া হয়নি।
তাহলে প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর হলেও জরুরি, কোন পথে গেল ৬ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার? কীভাবে ন্যূনতম ৫ লক্ষ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে তুরস্কের নাগরিকত্ব নেওয়া হলো?
এই অর্থ কি বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়েছে? তদন্তাধীন একজন ব্যক্তি কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের আশপাশে জায়গা পান?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু তারিখ নয়, দায়বদ্ধতার শপথ : জুলাই ২০২৪ আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতা প্রশ্নাতীত নয় পরিচয় ঢাল হতে পারে না আর সাংবাদিকতা ‘ম্যানেজ’ হয় না , এই প্রেক্ষাপটে জহিরুল ইসলাম ও মাযহারুল ইসলামের সিঙ্গাপুর ও তুরস্ক-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন, নাগরিকত্ব এবং বিনিয়োগের উৎস অবিলম্বে খতিয়ে দেখতে—দুদক,বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং সিআইডি ও মানিলন্ডারিং ইউনিট—এর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছি।
শেষ কথা : জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়— এটি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসের নাম। আর সেই সাহসই আজ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—রাষ্ট্র কি অপরাধীর সঙ্গে একই মঞ্চে থাকবে, নাকি জনগণের সঙ্গে?
