গণপূর্তের কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে ‘ঘুষের কারখানা’!  কাজ বণ্টনে সিন্ডিকেটের দাপট, কোণঠাসা সাধারণ ঠিকাদার — অভিযোগের কেন্দ্রে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক :  উন্নয়ন নয়, ভেতরে ভেতরে যেন চলছে “কাজ বাণিজ্যের অন্ধকার সাম্রাজ্য”! এমন বিস্ফোরক অভিযোগে তোলপাড় এখন গণপূর্ত অধিদপ্তর–এর কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিট। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি—এই ইউনিট কার্যত একটি নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের কবলে। এখানে নিয়ম-কানুন নয়, চলে কমিশন, রেট-কোড আর প্রভাবের রাজনীতি।অভিযোগের তীর নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের দিকে।


বিজ্ঞাপন

ঠিকাদারদের ভাষ্য  :  দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি চালু করেছেন “অগ্রিম কমিশনভিত্তিক কাজ বিক্রির মডেল”—যেখানে প্রকল্পের এস্টিমেট আগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে পছন্দের কয়েকজনের কাছে। বিনিময়ে ৩–৪ শতাংশ অগ্রিম ঘুষ! অর্থাৎ, কাজের আগে কমিশন—তারপরই টেন্ডার নামক আনুষ্ঠানিকতা।

টেন্ডার শুধু কাগজে-কলমে ?  ক্ষুব্ধ ঠিকাদারদের অভিযোগ, স্পেশাল ইউনিটে টেন্ডার এখন নিছক প্রহসন। অগ্রিম টাকা দিয়েও কাজ পাচ্ছেন না বহু লাইসেন্সধারী ঠিকাদার। কেউ কাজ পেলেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে—‘পছন্দের কোম্পানি’ থেকেই কিনতে হবে মালামাল। নির্দেশ অমান্য করলে চুক্তি বাতিলের মৌখিক হুমকির অভিযোগও রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

ফলে বছরের পর বছর সরকারি দপ্তরে মানসম্পন্ন সরবরাহ করা পুরোনো ঠিকাদাররা কার্যত বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, নাকি নিয়ন্ত্রিত বাজার?


বিজ্ঞাপন

প্রধান বিচারপতির বাসভবনের কাজ নিয়েও প্রশ্ন  : সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনে সম্পাদিত কাজের মান নিয়ে। পাশাপাশি অফিসকেন্দ্রিক নানা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগও ঘুরে বেড়াচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব বিতর্ক চাপা দিতেই সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার তাকে তড়িঘড়ি করে রাজশাহীতে বদলি করেন। কিন্তু নাটক এখানেই শেষ নয়। রাজশাহীতে কার্যত অফিস না করেই মাত্র ৮ মাসের মাথায় তিনি আবার ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—কোন প্রভাব বলয়ে সম্ভব হলো এমন প্রত্যাবর্তন?

“অস্বাভাবিক উত্থান’ এক প্রতিষ্ঠানের  : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম— ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড। অভিযোগ অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মডেল মসজিদসহ একাধিক প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। নথি অনুযায়ী— ২০২৫/১৩ নং লট: ৩,৫৩,৪৫,৮০২ টাকা, ২০২৫/৩ নং লট: ৩,৩৭,৩৭,৯০২ টাকা, ২০২৫/৪ নং লট: ৩,৩৭,৩৭,৯০২ টাকা। এছাড়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে—
রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ–এ ২৭ লাখ টাকা, শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরি–তে ১.৮২ কোটি টাকা, পাবলিক লাইব্রেরি বহুমুখী ভবন–এ প্রায় ১.৯৩ কোটি টাকার কাজ।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—ভবনের মূল নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে ফার্নিচার সরবরাহের চুক্তি সম্পন্ন হয়? পরিকল্পনা, অনুমোদন ও বাস্তব অগ্রগতির সমন্বয় কোথায়?

বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী কোম্পানির দৌরাত্ম  ?
অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে কয়েকটি প্রভাবশালী ফার্নিচার কোম্পানির নাম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সুবিধা দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে কোটি টাকার কাজ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি প্রকল্প কি এখন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া ব্যবসায় পরিণত?

পুরোনো অভিযোগ, নতুন প্রশ্ন :  সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অতীতেও উন্নয়ন প্রকল্পে বেনামী ঠিকাদারি, অর্থ আত্মসাৎ ও নানা বিতর্কে জাহাঙ্গীর আলমকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের জোরে আবার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে প্রত্যাবর্তনের অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে আলোচনায়।

অভিযুক্ত প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রথমে সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে যোগাযোগ করে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ তদন্তে কীভাবে সত্যতা পাওয়া গেল—এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান।

উল্লেখ্য : এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য ভুক্তভোগী ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রাপ্ত নথির ভিত্তিতে উপস্থাপিত অভিযোগ। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে—স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ছাড়া প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। গণপূর্তের এই ‘স্পেশাল ইউনিট’ কি উন্নয়নের কারখানা, নাকি ঘুষের কারখানা—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসনিক অন্দরে।

👁️ 96 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *