প্রশিক্ষণের নামে ‘আমলা তোষণ’!   অবসরের দ্বারপ্রান্তে প্রকৌশলী, প্রশাসনের আমলা—এইচভিএসি শেখার অজুহাতে আমেরিকা সফর !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  অবসরের মাত্র কয়েক মাস বাকি। কিন্তু এর মধ্যেই ‘কারিগরি প্রশিক্ষণ’ নিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) মো. আশ্রাফুল হক। একই প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা উপসচিব মো. নাজমুল আলম। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এইচভিএসি (HVAC) সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণের মতো হাতে–কলমে কারিগরি প্রশিক্ষণে এই দুই কর্মকর্তার অংশগ্রহণ কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে ইতোমধ্যে নিজ নিজ দপ্তরেই শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা–সমালোচনা। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, প্রকৃত প্রশিক্ষণের চেয়ে এটি যেন “বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ বাগিয়ে নেওয়ার পুরোনো আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি”।


বিজ্ঞাপন

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে–বাইরে অভিযোগ উঠেছে, প্রশিক্ষণের নামে এবারও দেখা যাচ্ছে ‘আমলা তোষণের নীতি’। যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাওয়া আট কর্মকর্তার তালিকায় রয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ প্রকৌশলী।

অথচ যিনি প্রকৌশলী, তিনি অবসরের খুব কাছাকাছি। ফলে প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগই থাকবে না বললেই চলে। তবুও ক্ষমতার দাপটে বিদেশ সফরের তালিকায় নাম তুলতে ভুল করেননি তারা—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।


বিজ্ঞাপন

‘প্রশিক্ষণ’ নাকি প্রমোদ ভ্রমণ  ?  গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের স্বাস্থ্যখাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত একটি প্রকল্পের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ দিনের একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছেন আটজন সরকারি কর্মকর্তা।


বিজ্ঞাপন

শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এইচভিএসি সিস্টেমের নিরাপত্তা সুবিধা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে গত ৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা–৭ থেকে একটি সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই প্রশিক্ষণে কারা যাচ্ছেন এবং কেন যাচ্ছেন? তালিকায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা সরাসরি এই প্রযুক্তিগত কাজের সঙ্গে জড়িত নন বলেই অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরোজ  : প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাওয়া আরেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান। তিনি মূলত সংস্থাপন বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। বদলি, নিয়োগ, পদোন্নতি, বাসা বরাদ্দসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত।

অভিযোগ রয়েছে, আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের আওতায় এই প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও প্রকল্পটির সঙ্গে ফিরোজ হাসানের কার্যত কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, দীর্ঘ এক যুগ ধরে ঢাকায় অবস্থান করা এই প্রকৌশলী সব সময় ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছিই ছিলেন।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিবর্তনের পর তার প্রভাব আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে এখন কোন প্রকল্পে কে বিদেশ যাবেন, কে কোন লোভনীয় পদে বসবেন—এসব বিষয়েও নাকি এককভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন তিনি।

মাঠের প্রকৌশলী বাদ, বিদেশে যাচ্ছেন ‘উপরের’ কর্মকর্তারা :
মূলত এই ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণে মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাজ করা প্রকৌশলীদের অংশ নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। এই সফরে অংশ নিতে যাওয়া অন্য কর্মকর্তারা হলেন—প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশরাফুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), বরিশাল জোন মো. রাজু আহমেদ, নির্বাহী স্থপতি সিদ্দিকা নাসরিন সুলতানা এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) রিসালত বারী।

ফোনে প্রশ্ন, নীরব আশ্রাফুল হক  :  বিদেশ সফর সম্পর্কে জানতে চেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) মো. আশ্রাফুল হকের মুঠোফোনে সাতবার কল করা হয়। কয়েকবার তিনি কলটি কেটে দেন। পরে তাকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয়— “শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ শিখতে আপনারা আটজন যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। কোম্পানির টাকায় বিদেশ যেতে নিরুৎসাহিত করে সরকার। এরপরেও আপনারা কেন যাচ্ছেন?” কিন্তু এর পরও তিনি কোনো জবাব দেননি।

কোম্পানির টাকায় বিদেশ সফর  :  এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, “ওদের টাকায় বিদেশ যাওয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই।” প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই সফরের যাবতীয় ব্যয় বহন করবে ‘ডানহাম–বুশ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি এইচভিএসি সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

টিআইবি বলছে—স্বার্থের দ্বন্দ্ব :  এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোম্পানির টাকায় বিদেশ যাওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সমস্যা। এসব সফরের নামে বাস্তবে কোনো কাজ হয় না।

এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি আরও বলেন, সরকারের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও এটি বড় ধরনের ঝুঁকি। কারণ সরকারের সঙ্গে ওই কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে।

ফলে এখানে স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইফতেখারুজ্জামানের মতে, বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে যেকোনো প্রযুক্তিগত তথ্য বা পণ্য সম্পর্কে জানা সম্ভব। অথচ কর্মকর্তারা বিদেশে গিয়ে সেই সময়ের জন্য সরকারি বেতন–ভাতাও নিচ্ছেন। তার ভাষায়, “এই অপতৎপরতা বন্ধ করা জরুরি।”

প্রশ্ন রয়ে গেল  : কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফরের তালিকায় অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা প্রকৌশলী, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি—গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই তৈরি করেছে অস্বস্তি।

প্রশ্ন উঠেছে— এটি কি সত্যিই প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের উদ্যোগ, নাকি ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে ওঠা আরেকটি ‘প্রশিক্ষণ-আবরণে প্রমোদ ভ্রমণ’?

👁️ 169 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *