!! নিয়োগ অনিয়ম থেকে শুরু, রাজনৈতিক বলয়ে উত্থান !! দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র ও বড় প্রকল্পে লুটের অভিযোগ !! বিদেশে পাচার হাজার কোটি টাকা !! অভিযোগকারীদের দাবি, নীরব দুদক–নিষ্ক্রিয় মন্ত্রণালয় !!


নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এলজিইডি—যেখানে সড়ক, সেতু, কালভার্ট, স্কুলভবন, আশ্রয়কেন্দ্র, বাজার উন্নয়নসহ কোটি কোটি মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে থাকা প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ চেয়ারে এখন আছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম—যাকে ঘিরে একাধিক সূত্রে যে চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর বিস্তার, তা শুধু একজন কর্মকর্তাকে নয়—একটি পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—নিয়োগ অনিয়ম → অস্বাভাবিক ক্ষমতায়ন → রাজনৈতিক সুরক্ষা → কমিশন বাণিজ্য → প্রকল্প লুট → বিদেশে অর্থ পাচার → কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ—এমন এক দীর্ঘ ও বিতর্কিত পথচলা।

নিয়োগ অনিয়মের গল্প: ফল প্রকাশের আগে সরকারি চাকরি ? কুয়েট থেকে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই এলজিইডির সরকারি (জিওবি) খাতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন জাবেদ করিম—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে ঘুরে ফিরে এসেছে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট ছিল—“বিএসসি পাস আবশ্যক।” কিন্তু ফল প্রকাশের আগেই নিয়োগ—এটি ছিল নিয়োগবিধির এক বড় ব্যতিক্রম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে—নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, কুয়েটের ফল প্রকাশের তারিখ, নির্বাচিত তালিকা ও যোগদানের তারিখ পাশাপাশি রাখলে “গুরুতর অনিয়ম” স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অনিয়ম প্রমাণ হলে, নিয়োগ বাতিল, বেতন-ভাতা ফেরত, প্রশাসনিক শাস্তি—সবই আইনসম্মত ব্যবস্থা।
জুনিয়র থেকে জেলার ‘অঘোষিত সম্রাট’: পাঁচ বছরের ক্ষমতা পাকিস্তানের আমল মনে করায় : ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জিয়া উল হক জিয়ার ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরেই শুরু হয় জাবেদ করিমের উত্থান—এমন অভিযোগ রয়েছে এলজিইডির ভেতরে।
একজন জুনিয়র সহকারী প্রকৌশলী কীভাবে, লক্ষ্মীপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পেলেন? কীভাবে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে তাকে বসানো হলো?
তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল হাসান নাকি এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপেই নাকি সব নিয়ম ভেঙে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় জেলার উন্নয়ন তহবিল।
সবচেয়ে বিস্ময়কর—এই “অতিরিক্ত দায়িত্ব” ছয় মাস নয়, টানা পাঁচ বছর। এই সময়টাকে এলজিইডির ভেতরকার প্রবীণ কর্মকর্তারা বলেন—“প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভাঙার শুরু।”
কমিশন বাণিজ্যের ‘স্বর্ণযুগ’: কাগজে কাজ, খাতায় বিল, হাতে কমিশন ? সূত্র বলছে—২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরে যত উন্নয়ন বরাদ্দ এসেছে, তার বেশিরভাগই ছিল কাগজে-কলমে দ্রুতগতির, আর বাস্তবে ছিল ঘুষ-কমিশন নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া।
অভিযোগগুলো হলো—কার্যাদেশে ৮–১০% পর্যন্ত কমিশন নেওয়া,একই রাস্তার নামে একাধিকবার বরাদ্দ আদায়, মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ, সব টেন্ডার হাতে লেখা—নিয়ন্ত্রণ ছিল “একচেটিয়া”এই সময় শত কোটি টাকার বেশি অবৈধ আয়,এই সময়টাকে এলজিইডির প্রবীণ কর্মকর্তারা আজও ডাকেন—“কমিশনের স্বর্ণযুগ”।
১/১১—গ্রেফতারের তালিকা ও ‘রহস্যময়’ মার্কিন উচ্চশিক্ষা :২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে উঠে আসে জাবেদ করিমের নাম—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
একই অভিযোগে বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রানা গ্রেফতার হন। কিন্তু জাবেদ করিমকে নাকি দ্রুত বের করে দেওয়া হয় উচ্চশিক্ষা স্কিমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ব্যবস্থা। সব ফাইল–নোটিং, অনুমোদন, ভিসা—খুব অল্প সময়ে। অভিযোগকারীদের ভাষায়—এটি ছিল গ্রেফতার এড়ানোর বিশেষ ব্যবস্থাপত্র।” ফিরে এসে আবারো তিনি এলজিইডির মূল ক্ষমতাকেন্দ্রে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
আওয়ামী সান্নিধ্য, তহবিলে অনুদান—আর পরে ‘জাতীয়তাবাদী পরিচয়’ ? ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ আমলে— গণভবনে অবাধ যাতায়াত, দলীয় তহবিলে মোটা অঙ্কের অনুদান, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রভাব, নিয়োগ-বদলিতে বিশেষ ভূমিকা—এমন অভিযোগ দেয় বিভিন্ন সূত্র। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলায়।
অভিযোগ—“আগে ছিলেন আওয়ামী বলয়ে, এখন নিজেকে জাতীয়তাবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছেন—ক্ষমতার বলয়ে থাকার জন্য পরিচয় বদলাচ্ছেন।”
দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রে ‘শত কোটি লোপাট’—আরো বড় অভিযোগ: বিদেশে পাচার হাজার কোটি টাকা : বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র—দেশের সবচেয়ে মানবিক ও জরুরি প্রকল্প। কিন্তু এখানেই নাকি হয়েছে বড় লোপাট।
সূত্র বলছে—প্রকল্পের মান কম দেওয়া, কম কাজ করেও পুরো বিল পরিশোধ, নির্ধারিত মানদণ্ড উপেক্ষা, নেপথ্যে রাজনৈতিক এপিএস–কেন্দ্রিক সংযোগ।
অভিযোগ—একমাত্র এই প্রকল্প থেকেই শত কোটি টাকা লোপাট।আরো বিস্ময়কর দাবি— বিদেশে পাচার করা অর্থ কমপক্ষে হাজার কোটি টাকা। দেশে–বিদেশে তাঁর সম্পদ নাকি কয়েক হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণের নামে বিল, সড়কে বাস্তবে গর্ত : তিনি ছিলেন সড়ক-সেতু রক্ষণাবেক্ষণের শীর্ষ পদে। অভিযোগকারীরা বলছেন—বাস্তবে নতুন সড়ক হয়নি, পুরোনো সড়ক সংস্কারও হয়নি,কিন্তু কাগজে–কলমে সব কাজ “সম্পন্ন” বিল পরিশোধ অব্যাহত, এই সময়ই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দুর্নীতি হয় “পদ্ধতিগত”এই সময়কে কর্মকর্তারা বলছেন— “রক্ষণাবেক্ষণহীন রক্ষণাবেক্ষণের অধ্যায়।”
পোস্টিং–প্রকল্প বাণিজ্য: বড় প্রকল্পের পরিচালক পদের দাম ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ? একজিইডির ভেতরের গুঞ্জন — বড় প্রকল্পের পরিচালক হতে দিতে হতো ৫০ লাখ–১ কোটি টাকা, বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়নেও চলত “লেনদেন”, ঘনিষ্ঠতার চেয়ে টাকার প্রবাহ ছিল মূল মাপকাঠি, এই পুরো সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন জাবেদ করিম—এমনই অভিযোগ, সূত্রের প্রশ্ন— “যদি সব মিথ্যা হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এত ক্ষোভ কেন?”
সরকারি চাকরি, বেতন ৮০–১২০ হাজার—তবে সম্পদ কয়েক হাজার কোটি ? সরকারি চাকরিজীবীর সম্পদ সীমিত হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ হলো— বিদেশে পাচার হাজার কোটি টাকা, দেশে–বিদেশে সম্পদ: কয়েক হাজার কোটি, সম্পদ বিবরণীতে আয়–ব্যয়ের বিশাল অমিল, দুদক নীরব, মন্ত্রণালয়ও উদাসীন—এ অভিযোগ বহুদিনের।
প্রশ্নের মুখে এলজিইডি—বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কোথায় ? এলজিইডি দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সংস্থা।
সেখানে যদি—নিয়োগ অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্প লুট, পোস্টিং-বাণিজ্য, সম্পদ পাচার
—এসব অভিযোগের পাহাড় দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে পুরো ব্যবস্থার সততা নিয়ে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— এসব অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত হবে কি? নাকি আবারও “উন্নয়ন” শব্দের আড়ালে সব চাপা পড়ে যাবে?
জাবেদ করিমের অবস্থান :ফোনে যোগাযোগ করেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
