
বিশেষ প্রতিবেদক : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র–জনতার গণআন্দোলনের মুখে যখন সাবেক আওয়ামী সরকার ক্ষমতা হারায়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সুবিধাভোগী বলয়ও ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সরকার পতনের পরও এক শ্রেণির তথাকথিত সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী মহল নতুন মোড়কে পুরোনো আদর্শ টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টায় সক্রিয়—এমন অভিযোগ এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে সাংবাদিক ও কলামিস্ট মানিক লাল ঘোষ–এর নাম।

প্রশ্ন উঠছে ‘নিরপেক্ষতা’ নিয়ে : সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর এক লেখায় বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালীর ভূমিকার প্রশংসা করা হলেও, সমালোচকদের মতে লেখাটির ভাষা ও কাঠামো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ব্যবহার করে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার কৌশল—এমন প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক স্মৃতিচারণ নয়; বরং ‘নির্বাচিত ইতিহাস’ (Selective History) ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করার একটি পরিচিত কৌশল।

লেজুড়বৃত্তিক সাংবাদিকতা কী আবার ফিরে আসছে ? ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যে সাংবাদিকতা ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে উঠেছিল, সেই ধারা কি নতুন বাস্তবতায়ও বহাল ? মানিক লাল ঘোষের মতো ব্যক্তিরা অতীত সরকারের সময় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন—এমন অভিযোগ অতীতেও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।

সমালোচকদের দাবি, তিনি বারবার এমন ভাষা ও বিষয় নির্বাচন করছেন যা সাবেক শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ন্যারেটিভকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেয়,, গণআন্দোলন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বা ছাত্র–জনতার ত্যাগের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হয় বা খাটো করে দেখা হয় সাংবাদিকতার মূলনীতি—ক্ষমতার প্রশ্ন তোলা—সেখানে অনুপস্থিত পতনের পরও ‘প্রভাব বলয়’ অটুট কেন? গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শুদ্ধাচারের দাবি উঠলেও বাস্তবে অনেকেই এখনো বহাল তবিয়তে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অতীতে রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে তৈরি হওয়া নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি ভাঙেনি। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন— “সরকার যায়, কিন্তু তাদের তৈরি করা বয়ানবাহকরা অনেক সময় থেকে যায়। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।”
গণমাধ্যম সংস্কার না হলে বিপদ থেকেই যাবে : এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন, সাংবাদিকতার নৈতিক জবাবদিহি,, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার প্রকাশ্য মূল্যায়ন, স্বাধীন ও জনমুখী গণমাধ্যম কাঠামো, নইলে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিলেও তার প্রেতাত্মা থেকে যাবে কলাম, টকশো আর আবেগী লেখার ভেতর।
শেষ কথা : মার্ক টালীর মতো আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের অবদান ইতিহাসের অংশ—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই ইতিহাসকে ঢাল বানিয়ে যদি আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের রক্তঝরা আন্দোলন আড়াল করা হয়, তবে প্রশ্ন তোলা অনিবার্য।
আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো : সাংবাদিকতা কি জনগণের পক্ষে থাকবে, নাকি পতিত ক্ষমতার স্মৃতির পাহারাদার হয়ে থাকবে ? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশে গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবে কি না।
