
নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রতিবছর বর্ষা এলেই যেন একই দৃশ্যপট—পানিতে ডুবে যায় রাজধানী ঢাকা। অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক, কোথাও স্বস্তি নেই। প্রায় তিন কোটি মানুষের এই শহর পরিণত হয় এক জলাবদ্ধতার নগরীতে। নাগরিকদের ভোগান্তি সীমাহীন, আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে তীব্র সমালোচনা ও ব্যঙ্গ। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন ডুবে থাকে ঢাকা?

খাল হারানোর শহর, জলাবদ্ধতার ফাঁদ : তথ্য বলছে, একসময় ঢাকায় ছোট-বড় ৭৬টি খাল থাকলেও এখন ৫৭টির অস্তিত্বই নেই। অবৈধ দখল, ভরাট আর দূষণে হারিয়ে গেছে এসব প্রাকৃতিক জলাধার। নদীবেষ্টিত শহরের প্রাণ ছিল এই খালগুলো—যেগুলোই এখন জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা ওয়াসা অবশিষ্ট খালগুলোর দায়িত্ব হস্তান্তর করে দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে। এরপর শুরু হয় ‘উন্নয়ন প্রকল্পের’ ধুম—খনন, সৌন্দর্যবর্ধন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ড্রেনেজ উন্নয়ন। কাগজে-কলমে সবই ছিল ‘গেমচেঞ্জার’। বাস্তবে? পানিতে ডুবে থাকা শহর।

৩ হাজার কোটি টাকার হিসাব—কোথায় গেল সুফল ? গত এক দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ উন্নয়ন, ৪টি প্রধান খাল পুনরুদ্ধার, ডিএনসিসি খাল উন্নয়ন প্রকল্প, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান এবং পাম্প স্টেশন স্থাপন।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে—এই বিশাল বিনিয়োগের পরও জলাবদ্ধতা কমেনি, বরং বেড়েছে।
সমন্বয়হীনতার জট , এক শহর, বহু কর্তৃপক্ষ : ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করে একাধিক সংস্থা—ঢাকা ওয়াসা, উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, রাজউক, এলজিইডি। কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র— কোথাও ড্রেন নির্মাণ হয়েছে, কিন্তু খালের সঙ্গে সংযোগ নেই, কোথাও খনন করা খাল আবার ভরাট হয়ে গেছে, অনেক নিষ্কাশন লাইন বন্ধ অবস্থায় পাম্প স্টেশন থাকলেও কার্যকারিতা সীমিত, ফলে বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম জলাবদ্ধতাকে আরও স্থায়ী করে তুলছে।
খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প—দৃশ্যমান কাজ, অদৃশ্য ফলাফল : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাল—মান্ডা, কালুনগর, জিরানী ও শ্যামপুর—উদ্ধারে নেয় প্রায় ৮৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প। এর মধ্যে— সরকার দিয়েছে: ৬২৯ কোটি টাকা, ডিএসসিসি দিয়েছে: ২৬৯ কোটি টাকা।
এছাড়া— ডিএনডি খালে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা এবং জিয়া সরণি খালে ৩০০ কোটি টাকা, সব মিলিয়ে বিশাল বাজেট। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই কাজের বাস্তব সুফল কোথায় ?
৮.৭ কিলোমিটার মান্ডা খালের জন্যই ধরা হয়েছে ২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা নিয়েও রয়েছে তীব্র বিতর্ক।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা : নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ বলছেন—“অধিকাংশ প্রকল্প আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে শহরব্যাপী জলাবদ্ধতা কমেনি।”
তার মতে—খালের সংযোগস্থলগুলো আবর্জনায় ভরা, পাম্প স্টেশনগুলো পর্যাপ্ত সক্ষম নয়, নতুন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
দুর্নীতির অভিযোগ—টাকার স্রোত, উন্নয়নের খরা : পরিবেশবিদ বাপ্পি সরদারের দাবি আরও বিস্ফোরক— গত ১০ বছরে বরাদ্দ ৩ হাজার কোটি টাকার বড় অংশই অপচয় বা লোপাট করা হয়েছে,।
ঢাকা ওয়াসা সবচেয়ে বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে উত্তর সিটিতে প্রায় ৩৫%, দক্ষিণে ৪৫% অর্থ দুর্নীতিতে হারিয়েছে, এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে—ঢাকা কি শুধু জলেই ডুবে, নাকি দুর্নীতিতেও ?
নাগরিক দায়ও কম নয় : বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যার পেছনে শুধু কর্তৃপক্ষ নয়, নাগরিকদের ভূমিকাও আছে— ড্রেনে প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা, খাল দখল ও ভরাটে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তা, পরিবেশ সচেতনতার অভাব ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সমাধান কোথায় ? বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন—সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, কার্যকর পাম্প স্টেশন, জবাবদিহিমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সম্পৃক্ততা।
শেষ কথা : কাগজে উন্নয়ন, মাঠে জলাবদ্ধতা—এই বৈপরীত্যই এখন ঢাকার বাস্তবতা। হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পরও যখন মানুষকে হাঁটুসমান পানিতে চলতে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—সমস্যা কি প্রকৃতিতে, নাকি ব্যবস্থাপনায় ? বর্ষা আসছে আবার। ঢাকা কি এবারও ডুববে—নাকি বদলাবে চিত্র ?
