
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানী ঢাকার প্রায় তিন কোটি মানুষের জন্য হাতিরঝিল ছিল একসময় স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। দিনের ক্লান্তি শেষে নগরবাসী খোলা বাতাসের আশায় এখানে ছুটে আসেন।

কিন্তু বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঝলমলে আলোকসজ্জা আর দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর আড়ালে হাতিরঝিল যেন পরিণত হয়েছে পচা পানি, দুর্গন্ধ আর প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক জীবন্ত প্রতীকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাতিরঝিলে পা রাখতেই নাকে এসে লাগে তীব্র পচা গন্ধ। দূর থেকে পানির সৌন্দর্য চোখে পড়লেও কাছে গেলে দৃশ্যপট বদলে যায়। লেকের পানি কুচকুচে কালো, কোথাও কোথাও আলকাতরার মতো ঘন। পানির ওপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও নানা ধরনের আবর্জনা।

এমন পরিস্থিতিতে খোলা বাতাসে হাঁটতে আসা মানুষজন বাধ্য হচ্ছেন নাকে রুমাল চেপে চলাফেরা করতে। অথচ এই হাতিরঝিলের পানি পরিষ্কার রাখতে এবং পরিবেশ রক্ষার নামে গত এক দশকে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাতিরঝিলের সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২,২৩৬ কোটি টাকা। লেকের দূষিত পানি শোধনের জন্য ঢাকা ওয়াসা নির্মাণ করেছে ৩,৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প। এর বাইরে রাজউক পানির মান উন্নয়নের জন্য আরও ৫৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়নি-ই, বরং প্রতি বছর কেবল ভাসমান ময়লা পরিষ্কার এবং বিভিন্ন অস্থায়ী ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনায় রাজউককে নিজস্ব তহবিল থেকে আরও ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?
মেগা প্রকল্পের আড়ালে সমন্বয়হীনতার মহড়া : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হাতিরঝিল দূষণের মূল কারণগুলো আজও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। ভারী বৃষ্টির সময় ধারণক্ষমতাহীন ডাইভারশন লাইনের চাপ সামাল দিতে স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়। ফলে চারপাশের ড্রেন ও নর্দমার বর্জ্য সরাসরি হাতিরঝিলে প্রবেশ করে।
একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পানি শোধনের উদ্যোগ, অন্যদিকে একই পানিতে অবাধে নোংরা বর্জ্য প্রবেশ—এ যেন রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের এক নির্মম পরিহাস। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য। অভিযোগ রয়েছে, এসব বর্জ্যের বড় একটি অংশ যথাযথ শোধন ছাড়াই ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে হাতিরঝিলে এসে মিশছে। ফলে লেকের পানি প্রতিনিয়ত আরও বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
পরিষ্কার হচ্ছে শুধু ওপরের ময়লা, ভেতরের পচন রয়ে গেছে অক্ষত : লেকে প্রতিদিন প্রায় দেড়শ পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করছেন। কাঠের নৌকায় করে জাল ও লাঠির সাহায্যে তারা ভাসমান আবর্জনা সংগ্রহ করছেন। কিন্তু এই কার্যক্রম মূল সমস্যার কোনো সমাধান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ, পানির ভেতরে জমে থাকা দূষণ, রাসায়নিক বর্জ্য ও পচনের উৎস বন্ধ না করে কেবল ভাসমান ময়লা সরানো মানে রোগ রেখে উপসর্গের চিকিৎসা করা।
দোষারোপের চক্রে বন্দি হাতিরঝিল : সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পরিস্থিতির দায় স্বীকার করতে রাজি নয় সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের এক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী বলেন, নকশাগত কিছু ত্রুটির কারণে পানি চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। লেকের মধ্যে নির্মিত কৃত্রিম রাস্তা পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। সেই রাস্তা এখন অপসারণ করা হচ্ছে। তবে ড্রেন দিয়ে নোংরা পানি প্রবেশ বন্ধ করা শুধু রাজউকের দায়িত্ব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ভারী বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে স্লুইস গেট খুলে দেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। তার মতে, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে সব দায় ওয়াসার ওপর চাপানো যায় না।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ড্রেন পরিষ্কারের কাজ তারা নিয়মিত করেন। কিন্তু শিল্পকারখানাগুলো যদি বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি লাইনে ছেড়ে দেয়, তাহলে দূষণ ঠেকানো সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর ও রাজউকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ফলে এক সংস্থা আরেক সংস্থার দিকে আঙুল তুললেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
‘৫৫ কোটি নয়, ৫৫০ কোটি টাকাও কাজে আসবে না’
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতিরঝিলের বর্তমান সংকট কেবল অর্থের অভাবের কারণে নয়; বরং দায়হীনতা, সমন্বয়হীনতা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগই এর মূল কারণ।
নগর পরিকল্পনাবিদ এবং আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, হাতিরঝিলের মূল পরিকল্পনা ও লক্ষ্য থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদন করে পানির মান ঠিক করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ এবং একটি একক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ আইন কিংবা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী কোনো অবস্থাতেই খোলা ড্রেন বা ডাইভারশন লাইনের মাধ্যমে বিষাক্ত বর্জ্য হাতিরঝিলে প্রবেশ করতে পারে না। বর্তমানে যে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলো রয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, শুরু থেকেই হাতিরঝিলের জন্য একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত রক্ষণাবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন ও রাজস্বকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পুরো ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। অবহেলা বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
নগরবাসীর ক্ষোভ: ‘হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?’
হাতিরঝিলে ঘুরতে আসা মানুষের কণ্ঠেও শোনা গেছে হতাশা ও ক্ষোভ।
বাড্ডার বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা নাসিরউদ্দিন বলেন, “সারাদিন অফিস করার পর একটু খোলা বাতাসে বসতে আসি। কিন্তু এখানে এসে পাঁচ মিনিটও স্বস্তিতে থাকা যায় না। এত টাকা খরচ হলো, কিন্তু দুর্গন্ধ তো কমল না।”
মগবাজারের বাসিন্দা শামীমা আক্তার বলেন, “ডাক্তারের পরামর্শে হাঁটতে আসি। কিন্তু গন্ধের কারণে বুকভরে শ্বাস নিতেই ভয় লাগে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আসিফ আহমেদ বলেন, “একসময় বন্ধুদের নিয়ে নিয়মিত এখানে আসতাম। এখন পানির রঙ কালো, বাতাসও দূষিত। আগের হাতিরঝিল আর নেই।”
স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা : চিকিৎসকদের মতে, পচা ও দূষিত পানি থেকে নির্গত বিভিন্ন গ্যাস দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নিয়মিত এই পরিবেশে অবস্থান করলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে নিয়মিত হাঁটতে আসা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
শেষ কথা : হাতিরঝিল আজ যেন একটি নির্মম প্রশ্নচিহ্ন—হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, অসংখ্য পরিকল্পনা, একের পর এক উন্নয়ন উদ্যোগ; কিন্তু ফলাফল কোথায়?
যে লেক হওয়ার কথা ছিল রাজধানীর স্বস্তির আশ্রয়, সেটিই আজ পরিণত হয়েছে সমন্বয়হীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং দায় এড়ানোর সংস্কৃতির প্রতীকে।
রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের হিসাব আছে, প্রকল্পের নাম আছে, উদ্বোধনের ছবি আছে—শুধু নেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। আর সেই ব্যর্থতার দুর্গন্ধ আজও ভেসে বেড়াচ্ছে হাতিরঝিলের বাতাসে।
