
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক গভীর রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতার পালাবদলে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ এখন আর চাপা নেই। অবিচার, দুর্নীতি, অনিয়ম, গুম-খুন, অপমৃত্যু, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং বেকারত্ব—এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো কাঠামো দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে—এমনটাই মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

আওয়ামী লীগ: ক্ষমতা থাকলেও আস্থার সংকট : দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের অভিযোগে জর্জরিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে উন্নয়নের ভাষ্য থাকলেও সামাজিক ন্যায়বিচারের ঘাটতি মানুষের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে।
জাতীয় পার্টি: অবস্থানহীনতার রাজনীতি : জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা ও বিরোধিতার মাঝামাঝি অবস্থানে থেকেছে। এই কৌশল দলটিকে টিকিয়ে রাখলেও জনসমর্থন বিস্তারে ব্যর্থ করেছে। রাজনৈতিক সংকটে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ার প্রবণতা দলটির প্রতি আস্থাহীনতা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিএনপি: প্রত্যাশা ও মূল্যায়নের ফাঁক : বিরোধী শক্তি হিসেবে বিএনপির প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক আত্মত্যাগের যথাযথ রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও সাংগঠনিক রূপ দিতে না পারার অভিযোগ উঠেছে। দলীয় সংস্কার, নতুন নেতৃত্ব ও বাস্তবমুখী রোডম্যাপের অভাব বিএনপিকে এখনো পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পে পরিণত করেনি—এমন ধারণা বিস্তৃত।

সমাজের ভেতর থেকে উঠছে সংস্কারের দাবি : কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, ছাত্রসমাজ, বিবেকবান গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ নাগরিক—সব স্তরেই এখন সংস্কারের দাবি জোরালো। মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মৌলিক রূপান্তর চায়। এই প্রেক্ষাপটে পুরনো রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল আর কার্যকর থাকছে না।
নতুন জোটের সম্ভাবনা: ৯১–এর পুনরাবৃত্তি ? এই শূন্যতায় সামনে আসছে জামায়াত, এনসিপি, এলডিপি, এবি পার্টিসহ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির জোট। তাদের সমর্থকদের দাবি—এই জোটই বর্তমান বাস্তবতায় সংস্কার, নৈতিকতা ও জবাবদিহির রাজনীতি উপস্থাপন করতে পারবে। আবেগ, বিবেক ও বাস্তবতার মেলবন্ধনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মতো একটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় আসছে।
উপসংহার : বাংলাদেশের মানুষ এখন আর কেবল দল বদল নয়—রাজনীতির চরিত্র বদল দেখতে চায়। যারা এই পরিবর্তনের ভাষা, কাঠামো ও নেতৃত্ব দিতে পারবে, তারাই আগামী দিনের রাজনীতিতে এগিয়ে থাকবে। আসন্ন নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠছে পুরনো রাজনীতির বিচার ও নতুন সম্ভাবনার রেফারেন্ডাম।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে এই কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ ও বাস্তবতার প্রতিফলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন জনমনে প্রবল।
