
নিজস্ব প্রতিবেদক : গত ৫ আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র–জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক বাঁক। এই আন্দোলনের সম্মুখযোদ্ধারা—যারা আজ পরিচিত ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে—রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে জীবন বাজি রেখেছিলেন। সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক ফসল হিসেবেই ঘোষিত হয়েছিল ‘জুলাই ঘোষণা’।

কিন্তু আজ, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একযোগে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটকে ঘিরে যা ঘটছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে—
জুলাই ঘোষণা কি জনগণের চুক্তি ছিল, নাকি ক্ষমতার বৈধতা আদায়ের কৌশল?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থান : নিরপেক্ষতার দেয়াল ভাঙলেন কি? প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ রাজনৈতিক উত্তরণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিলেন, তিনি নিজেই জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেন।

সমালোচকদের মতে, “যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃত্বের আসনে থাকা ব্যক্তি একটি পক্ষের পক্ষে অবস্থান নেন, তখন গণভোট আর স্বাধীন থাকে না—তা হয়ে ওঠে দিকনির্দেশিত।” এ অবস্থায় জুলাই যোদ্ধাদের প্রশ্ন— যে রাষ্ট্রপুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখিয়ে রাস্তায় নামা হয়েছিল, সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের এমন একতরফা আহ্বান কতটা নৈতিক?

নির্বাচন কমিশন বনাম সরকার: কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনের কড়া বার্তা : প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়— প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে কোনো ধরনের প্রচারে যুক্ত হতে পারবেন না
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমে বলেন, “এ ধরনের প্রচার গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং আরপিও ১৯৭২-এর ৮৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই নির্দেশনা কি কাগজেই সীমাবদ্ধ? মাঠের বাস্তবতা: সচিবালয় থেকে ব্যাংক—সবখানে ‘হ্যাঁ’ প্রচার ইসির নির্দেশনার বিপরীতে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
সচিবালয় ভবন : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রকল্প কার্যালয় সবখানেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, গণভোটের প্রচারে ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ অর্থ কোন প্রক্রিয়ায়, কার তত্ত্বাবধানে ব্যয় হচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনকর্মীরা।
আখতার আহমেদের বক্তব্য: দায় এড়ানোর কৌশল ? নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “এই ব্যানার কে বা কারা লাগিয়েছে, আমরা জানি না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিওও হতে পারে।” কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন—সরকারি ভবনের ভেতরে ব্যানার লাগাতে বেসরকারি অনুমতি লাগে না?
তবে প্রশাসন কী করছিল ? উপদেষ্টারা ‘ব্যক্তিগত’, কিন্তু ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় ? নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন, তাই তারা প্রচার করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন–অধ্যাপক আলী রীয়াজ (গণভোট সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী)
তিনি জানিয়েছেন, “আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” জুলাই যোদ্ধাদের কণ্ঠে প্রশ্ন— রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে’ প্রচার—এটা কি চোখে ধুলো দেওয়া নয়?
সরকার অসন্তুষ্ট, আইন বদলের চিন্তা ! সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় উচ্চপর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এমনকি— ইসি যে আইন দেখিয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেই আইন সংশোধন বা নতুন অধ্যাদেশ জারির কথাও ভাবা হচ্ছে। এটি কি তবে স্পষ্ট বার্তা নয় যে— গণভোটকে প্রয়োজন হলে আইন বদলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে?
জুলাই যোদ্ধাদের শেষ প্রশ্ন : যে তরুণেরা ৫ আগস্ট রাজপথে নেমেছিল— লাঠি, গুলি আর মামলা মাথায় নিয়ে— তারা আজ প্রশ্ন করছে— আমরা কি সংস্কারের জন্য রক্ত দিয়েছিলাম, না ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার লাইসেন্স দিতে ? গণভোট কি জনগণের রায়, নাকি রাষ্ট্রের নির্দেশ ?
উপসংহার : ড. মুহাম্মদ ইউনূস, কাজী হাবিবুল আউয়াল, আখতার আহমেদ— এই নামগুলো এখন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এই অধ্যায় লিখবে— জুলাই যোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণ হলো, নাকি সেই স্বপ্নই গণভোটের ব্যানারে আটকে গেল।
