ঈদুল আজহায় লোভ নামের পশুর কোরআনের মাধ্যমে মানবতা মুক্তি পাক

Uncategorized ইতিহাস ঐতিহ্য জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সম্পাদকীয়

আমিনুর রহমান বাদশা  :  ঈদুল আজহা—এটা শুধু একটি উৎসব নয়, এটা এক মহিমাময় মহাবিপ্লবের নাম। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করে। কিন্তু এই কোরবানির রক্তের দাগ মাটিতে শুকানোর আগেই আমাদের বুঝতে হবে, আসল কোরবানি শুরু হয় তার পর থেকে। কারণ কোরবানি মানে শুধু পশু জবাই নয়, কোরবানি মানে নিজের ভেতরের পশুটাকে জবাই করা।


বিজ্ঞাপন

হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন কলিজার টুকরা ইসমাইল আ.-কে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করতে গিয়েছিলেন, আল্লাহ তখন পশু দিয়ে সেই ত্যাগের পরীক্ষা কবুল করলেন। এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, স্রষ্টা আমাদের পশুর রক্ত চান না, চান আমাদের নিয়ত। চান আমরা আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা তাঁর নামে, তাঁর সৃষ্টির কল্যাণে বিলিয়ে দিতে শিখি। আর আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কী? আমাদের লোভ, আমাদের অহংকার, আমাদের হিংসা, আমাদের ক্ষোভ, অন্য ধর্মকে ছোট ভাবার সেই কুৎসিত মানসিকতা। এগুলোই হলো আমাদের ভেতরের পশুত্ব। ঈদুল আজহার ছুরি সবার আগে চালাতে হবে এই পশুত্বের গলায়। যেদিন আমি আমার রাগকে, আমার স্বার্থপরতাকে, আমার সাম্প্রদায়িকতাকে কোরবানি দিতে পারব, সেদিনই আমার ঈদ পূর্ণ হবে।

আজকের দুনিয়া ভোগের প্রতিযোগিতায় উন্মত্ত। যেদিকে তাকাই, সেদিকেই ‘আমার চাই’, ‘আরও চাই’য়ের হাহাকার। কিন্তু কোরবানি আমাদের শেখায় সম্পূর্ণ উল্টো ‘আগে তুমি নাও’। ত্যাগের সর্বোচ্চ রূপ হলো ভালোবাসা। আর ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা অন্যের সুখের জন্য বিলিয়ে দেওয়া। আমরা কোরবানির মাংস তিন ভাগ করি। এক ভাগ নিজের, এক ভাগ আত্মীয়ের, এক ভাগ সমাজের অসহায় মানুষের। এই ভাগাভাগির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ঈদের আসল শিক্ষা। আমার পাশের বাসার মানুষটা যদি অভুক্ত থাকে, আমার প্রতিবেশী যদি অন্য ধর্মের হয়েও এক টুকরো মাংসের জন্য তাকিয়ে থাকে, তবে আমার কোরবানি কবুল হবে না। আমার আনন্দ তখনই পূর্ণ হবে, যখন তার মুখে হাসি ফুটবে। এটাই অসাম্প্রদায়িকতা। এটাই স্রষ্টার আনুগত্য ও সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসার মিলন।


বিজ্ঞাপন

লোভ, মোহ, ক্ষোভ—এগুলো মানুষের চিরকালের শত্রু। পৃথিবী যত দিন থাকবে, ত্যাগ আর ভোগের এই দ্বন্দ্বও তত দিন চলবে। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো ভোগের লাগাম টেনে ধরা। যখন একজন মানুষ ১৫ লাখ টাকার গরু কিনে ফেসবুকে ছবি দেয়, আর তার বাসার পাশের বস্তিতে এক মা সন্তানের জন্য এক টুকরো মাংস জোগাড় করতে পারে না, তখন বুঝতে হবে আমরা কোরবানির মর্ম বুঝিনি। ত্যাগ মানে লোক দেখানো নয়, ত্যাগ মানে বিলিয়ে দেওয়া। ত্যাগ মানে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে ওঠা।


বিজ্ঞাপন

কোরবানির এই মহান শিক্ষা যদি আমরা ধারণ করতে পারি, তাহলে পৃথিবীটা কেমন হবে? সেটা হবে ভ্রাতৃত্বের পৃথিবী, যেখানে ধর্মের পরিচয়ের আগে আমরা সবাই মানুষ। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, আমরা সবাই এক আদমের সন্তান। সেটা হবে সহনশীলতার পৃথিবী, যেখানে আমি আমার ধর্ম পালন করব, আর অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করব। কারণ, স্রষ্টা তো এক, পথ শুধু ভিন্ন। সেটা হবে দেশপ্রেমের পৃথিবী, যেখানে দেশের জন্য দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, পরিবেশ ধ্বংসের মতো পশুত্বগুলোকে কোরবানি দেওয়াই হবে আধুনিক যুগের ইব্রাহিমি ত্যাগ। আর সেটা হবে মানবিক মর্যাদার পৃথিবী, যেখানে ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, মজলুমের পাশে দাঁড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় ইবাদত।

তাই প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আসুন এই ঈদুল আজহায় আমরা শুধু পশু নয়, নিজের ভেতরের সমস্ত অন্ধকারকে কোরবানি করি। হিংসা, লোভ, ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা—সব। আমরা অঙ্গীকার করি, আমার আনন্দ তখনই পূর্ণ হবে যখন আমার প্রতিবেশী আনন্দে থাকবে। আমার ত্যাগ তখনই সার্থক হবে যখন তা একটি শিশুর মুখে হাসি ফোটাবে, একটি সমাজে সেতুবন্ধন গড়বে।

মনে রাখবেন, আল্লাহর কাছে মাংস পৌঁছায় না, রক্তও পৌঁছায় না। পৌঁছায় আমাদের তাকওয়া, আমাদের ত্যাগ, আমাদের বিশুদ্ধ নিয়ত। এই বিশ্ব চরাচর ভোগের জন্য নয়, ত্যাগের জন্য সৃষ্টি। আর ত্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শান্তি, আছে মানবতা, আছে প্রকৃত ভালোবাসা।

আসুন, ত্যাগের এই পবিত্র আলোয় নিজেদের উদ্ভাসিত করে আমরা একটি যুদ্ধহীন, ক্ষুধাহীন, বিভেদহীন পৃথিবী গড়ার শপথ নিই। কারণ ত্যাগেই মুক্তি, ত্যাগেই আনন্দ। ঈদ মোবারক।

👁️ 33 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *