
রাজউকের নবনিযুক্ত সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শামসুল আলম।

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)—বরাবরই দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত। কিন্তু এবার যেন সেই পুরোনো সব রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেলেন নবনিযুক্ত সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শামসুল আলম।
দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই কোটি কোটি টাকার রহস্যজনক “লোন চুক্তি”, সুদে-আসলে বিপুল অর্থ ফেরতের অঙ্গীকার এবং “কাজ দিয়ে টাকা পরিশোধের” প্রতিশ্রুতি ঘিরে তৈরি হয়েছে বিস্ময়, ক্ষোভ ও তীব্র প্রশ্ন।

অভিযোগ উঠেছে, চলতি মাসের ৩ তারিখে রাজউকের সদস্য হিসেবে বদলি হওয়ার পর থেকেই একের পর এক গোপন আর্থিক চুক্তিতে জড়িয়ে পড়েন এই যুগ্ম সচিব।


সংশ্লিষ্ট একাধিক নথিতে দেখা গেছে, তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ “লোন” হিসেবে নিয়েছেন। তবে এসব ঋণ কোনো সাধারণ আর্থিক লেনদেন নয়—বরং ভবিষ্যৎ দুর্নীতির অগ্রিম বন্দোবস্ত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিতে শামসুল আলম ১৬ কোটি টাকা গ্রহণের বিপরীতে ১৮ মাস পর ২০ কোটি টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করেছেন।
আরেকটি চুক্তিতে ২৪ মাসে লভ্যাংশসহ ৫৬ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এমন অন্তত চার থেকে পাঁচটি চুক্তিপত্র এখন ঘুরছে বিভিন্ন মহলে, যা নিয়ে রাজউকের অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে চাপা আলোচনা।

সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ হলো—ঋণ পরিশোধের পদ্ধতি নিয়েই। চুক্তিপত্রগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, এই অর্থ “ক্যাশ অথবা কাজের মাধ্যমে” পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ সরকারি দায়িত্বে থেকে প্রকল্প, প্লট, বরাদ্দ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা দিয়ে অর্থ শোধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল অনৈতিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ দুর্নীতির লিখিত ঘোষণা।
প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি সদ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পেয়েছেন, তিনি হঠাৎ কেন শত কোটি টাকার দায়ে জড়াবেন? কী এমন জরুরি প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল যে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে একের পর এক উচ্চসুদের আর্থিক চুক্তি করতে হলো ?

অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ পদটি “ম্যানেজ” করতেই। অর্থাৎ বদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। আর সেই টাকা জোগাড় করতেই বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে সুদে বিপুল অঙ্কের অর্থ ধার নিয়েছেন শামসুল আলম।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—চুক্তির নিরাপত্তা হিসেবে তিনি বিভিন্ন পক্ষকে নিজের ব্যাংক হিসাবের ব্ল্যাংক চেক দিয়েছেন। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের একটি স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেকের কপিও ঘুরছে সংশ্লিষ্ট মহলে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন অনেকে।
শামসুল আলমের অতীত নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ধারাবাহিকভাবে “লাভজনক” ও “ধান্দাবাজির” পোস্টিং পেয়েছেন। প্রশাসনের ভেতরে তার পরিচিতি ছিল প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে। আর এখন দেশের সবচেয়ে বিতর্কিত ও দুর্নীতিপ্রবণ সংস্থাগুলোর একটি রাজউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেই যেন আরও বড় খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

এই চুক্তিপত্র ও আর্থিক সমঝোতা নিয়ে শামসুল আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
সুশাসনকর্মীরা বলছেন, যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দুর্নীতির ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ আর্থিক অপরাধের ভয়াবহ নমুনা। একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের আগেই যদি “কাজ দিয়ে টাকা শোধের” প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে—এ প্রশ্ন এখন
