
বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনীতিতে মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা নিয়ে যে কৌতুক-ব্যঙ্গ তৈরি হয়েছে, তা এখন রীতিমতো রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অতীতের বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রিসভার আকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের পদবণ্টনের তুলনা টেনে প্রশ্ন উঠছে—শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিত্বের এই বিস্তার কোথায় গিয়ে থামবে?

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মোট ৬২ জনকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় তাঁর মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৫২ জন।
অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার তৃতীয় ও শেষ মন্ত্রিসভায় সদস্যসংখ্যা ছিল ৬০। তবে ওই ৬০ জন একই সময়ে মন্ত্রিসভায় ছিলেন, নাকি মেয়াদের বিভিন্ন সময়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দায়িত্ব পেয়েছিলেন—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রয়োজন।

অন্যদিকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকার গঠনের সময় থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে এসব দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আরও পাঁচ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নেওয়ায় মোট সংখ্যা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে—বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্য কোনো মন্ত্রিসভায় কি একই সময়ে এত বিপুলসংখ্যক সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন? কিংবা কোনো প্রধানমন্ত্রীর এত বেশি উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী ছিল কি না, সেটিও তুলনামূলক গবেষণার বিষয় হতে পারে।
মন্ত্রিসভা বড় হওয়ার রাজনীতি : মন্ত্রিসভার আকার বড় হওয়া কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা, প্রশাসনিক সমন্বয়, ব্যয় এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত। সংসদে বিপুলসংখ্যক সদস্যকে নির্বাহী দায়িত্বে যুক্ত করার প্রবণতা থাকলে একদিকে রাজনৈতিক সন্তুষ্টি তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো কতটা কার্যকর থাকবে—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলা যায়, যদি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টার সংখ্যা এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে আগামী সাড়ে চার বছরে বাংলাদেশ হয়তো উপমহাদেশের বৃহত্তম মন্ত্রিসভার একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
সেক্ষেত্রে মাত্র সাড়ে তিনশো সাংসদকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বানানোও অসম্ভব কিছু নয়। একেকটি মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন উপমন্ত্রী, একাধিক উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারী নিয়োগের মাধ্যমে সংসদের প্রায় সব সদস্যকেই মন্ত্রিত্বের স্বাদ দেওয়া সম্ভব—এমনই এক ব্যঙ্গাত্মক প্রস্তাব সামনে আসছে।
মন্ত্রণালয় ভাঙলেই কি সমাধান?
এত বিপুলসংখ্যক পদ সৃষ্টি করতে নতুন নতুন মন্ত্রণালয় খোলারও প্রয়োজন নেই—এমন একটি রসাত্মক যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বড় নামের কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে ভাগ করে দিলেই অনেক নতুন মন্ত্রণালয় তৈরি করা সম্ভব।
যেমন—‘স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়’কে ভাগ করে করা যেতে পারে ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়’, ‘পল্লি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ এবং ‘সমবায় মন্ত্রণালয়’। একইভাবে ‘আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ থেকে তৈরি হতে পারে ‘আইন মন্ত্রণালয়’, ‘বিচার মন্ত্রণালয়’ ও ‘সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়’।
‘বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়’কে ভাগ করে করা যেতে পারে ‘বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়’, ‘খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’ এবং ‘জ্বালানি মন্ত্রণালয়’।
‘নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ হতে পারে ‘নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ ও ‘শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’। আর ‘প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’ ভাগ হয়ে যেতে পারে ‘প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়’ এবং ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’।
অর্থাৎ, মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য প্রশাসনিক কাঠামো আমূল পাল্টানোরও দরকার নেই—শুধু নামের মধ্যে থাকা একাধিক বিষয়কে আলাদা করলেই নতুন পদ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান মন্ত্রণালয়’ থেকে ‘ওসমান গনি অ্যাফেয়ার্স’ : এরপরও যদি পর্যাপ্ত পদ না হয়, তাহলে ব্যঙ্গের ভাষায় আরও কয়েকটি নতুন মন্ত্রণালয় খোলার প্রস্তাবও আসতে পারে।
এর মধ্যে একটি হতে পারে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান মন্ত্রণালয়’। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় স্মৃতি, স্থাপনা, ইতিহাস, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন কর্মসূচির সমন্বয়ের জন্য এমন একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা ব্যঙ্গাত্মক হলেও রাজনৈতিক বিতর্কে এর আলাদা তাৎপর্য রয়েছে।
আরেকটি কল্পিত মন্ত্রণালয়ের নাম হতে পারে—‘মিনিস্ট্রি অব ওসমান গনি অ্যাফেয়ার্স’। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের তালিকাও হতে পারে বিস্তৃত ও বিচিত্র—ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান গনির নামে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ, তাঁর প্রিয় মুড়ি-বাতাসার বৈজ্ঞানিক উৎপাদন ও বিদেশে রপ্তানি, জুলাই স্পিরিটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা, তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে আরও নানা কর্মকাণ্ড।
ব্যঙ্গের মাত্রা আরও বাড়িয়ে বলা যায়, বাচ্চাদের প্রমিত, বিশুদ্ধ ও সভ্য বাংলায় স্লোগান দেওয়া এবং বক্তৃতা শেখানোও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হতে পারে।
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী : বিশ্ববিদ্যালয়’-এর পালটা উদ্যোগ হিসেবে ঝালকাঠিতে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে ‘বিশ্বাউয়া বিশ্ববিদ্যালয়’—যেখানে ব্যঙ্গাত্মক কল্পনায় এমন সব ‘বিশেষায়িত শিক্ষা’ চালু হবে, যা বাস্তব শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সর্বশেষ সংযোজন—‘মিনিস্ট্রি অব ভাইয়া অ্যাফেয়ার্স’
মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর ব্যঙ্গাত্মক পরিকল্পনার সর্বশেষ সংযোজন হতে পারে ‘মিনিস্ট্রি অব ভাইয়া অ্যাফেয়ার্স’।
এই মন্ত্রণালয়ের কাজ হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন মানবিক ও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকা মুহূর্তগুলো ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা—নিজ হাতে গাড়ি চালানো, নিজ পায়ে হেঁটে সচিবালয় থেকে ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে যাওয়া, স্ত্রীর মাথায় ছাতা ধরে হাঁটা, পেছনের সারিতে বসে নাটক-সিনেমা দেখা, শিশুদের বানানো গাড়িতে চড়া, একশো টাকায় লাঞ্চ করা কিংবা গভীর রাতে নিজ হাতে গাড়ি চালিয়ে ঢাকার পরিস্থিতি দেখতে বের হওয়ার মতো দৃশ্য।
এমনকি গৃহপালিত বেড়াল জেবুন নাহারের সঙ্গে খুনসুটির দৃশ্যও যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়, সেটিও এই মন্ত্রণালয়ের প্রচার কার্যক্রমের অংশ হতে পারে—এমনই রসিকতা করা হয়েছে।
আর এসব ভিডিও থেকে ফেসবুক-ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যে অর্থ আয় হবে, তার ৯০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে সেই অর্থে ‘দ্বিতীয় পদ্মা সেতু’ নির্মাণের কল্পনাও করা যেতে পারে।
প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার আকার নিয়েই : অবশ্য পুরো বিষয়টিকে নিছক রসিকতা হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। মন্ত্রিসভা যত বড় হবে, রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো কি তত বেশি কার্যকর হবে? নাকি অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি রাজনৈতিক সন্তুষ্টি ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠবে?
একই সঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং সংসদের সব সদস্যকে মন্ত্রী বানানোর ব্যঙ্গাত্মক প্রস্তাবের আড়ালে আসলে যে প্রশ্নটি রয়েছে, তা হলো—মন্ত্রিসভার সাফল্য কি সদস্যসংখ্যায়, নাকি দক্ষতা, জবাবদিহি ও কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনায়?
সংসদের প্রত্যেক সদস্যকে মন্ত্রিত্বের স্বাদ দেওয়ার কল্পনা যতই চমকপ্রদ হোক, একটি কার্যকর সরকারের জন্য শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন পদবির বিস্তার নয়—দায়িত্বের স্বচ্ছ বণ্টন, দক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনগণের কাছে জবাব দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
আর যদি মন্ত্রিত্বের দৌড় সত্যিই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, তাহলে ব্যঙ্গের ভাষায় বলা যায়—শেষ পর্যন্ত সংসদ আর সংসদ থাকবে না; পুরো সংসদই হয়ে যাবে মন্ত্রিসভা।
