
বিশেষ প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঘিরে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগে অর্থ লেনদেন এবং প্রভাব বিস্তারের যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক অসন্তোষের বিষয় নয়—এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে এলজিইডির প্রশাসন শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শফিকুর রহমানের নাম। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর প্রভাব রয়েছে এবং একটি কথিত চক্রের মাধ্যমে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে নেই এবং অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। শফিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

১৯৭ পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকার অভিযোগ : এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে প্রায় ১৯৭ কর্মকর্তার পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগ সত্য হলে ১৯৭ কর্মকর্তাকে ঘিরে কথিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে কয়েক কোটি টাকায়। কারও কাছ থেকে অর্থ না পেলে তাঁর ফাইল আটকে রাখা বা প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—পদোন্নতি যদি যোগ্যতা, দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়ার কথা, তাহলে সেখানে অর্থের এমন অঙ্কের আলোচনা কেন?

১৩৫ কর্মকর্তার পদোন্নতিতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ :
সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে প্রায় ১৩৫ কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। সার্ভেয়ারদের পদোন্নতিতেও ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠতা অগ্রাহ্য করে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে যাওয়ার জন্য কোনো কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে ৭–৮ লাখ টাকা পর্যন্ত কথিত ‘বিশেষ ব্যবস্থা’র কথা বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং যেন ‘মূল্য নির্ধারিত’ ! পদোন্নতির পর বদলি-পদায়ন নিয়েও অভিযোগ আরও বিস্ফোরক। সূত্রগুলোর দাবি, এলজিইডির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে যেতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থের দাবি করা হতো।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে— সাভার: কাঙ্ক্ষিত একটি পদে পোস্টিংয়ের জন্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ।
জাজিরা: সহকারী প্রকৌশলীর একটি পদে বদলির ক্ষেত্রে প্রায় ১০ লাখ টাকা নির্ধারণের অভিযোগ।
বরিশাল সদর–বাবুগঞ্জ: একজন প্রকৌশলীকে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রায় ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ। এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু অভিযোগগুলো সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট বদলি-পদায়নের নথি, নোটশিট, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য খতিয়ে দেখা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
দেড় কোটি টাকার কথিত নিয়োগ ‘সমঝোতা’ : এলজিইডির নিয়োগ নিয়েও পুরোনো অভিযোগ সামনে এসেছে। সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের দায়িত্বকালে একটি নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড় কোটি টাকার কথিত সমঝোতা হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, ‘আব্দুল ওহাব’ নামে এক কথিত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থ লেনদেন সমন্বয়ের পরিকল্পনা করা হয়। সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কথিত সমঝোতার মধ্যে— ১ কোটি টাকা তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর জন্য, ৩০ লাখ টাকা শফিকুর রহমানের জন্য, অবশিষ্ট অর্থ সংশ্লিষ্ট অন্যদের মধ্যে ভাগ করার পরিকল্পনা ছিল।
১২ প্রকৌশলীর পদোন্নতিতে বিধি লঙ্ঘনের প্রশ্ন : এলজিইডির আরও ১২ প্রকৌশলীর পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, প্রচলিত বিধিমালা ও জ্যেষ্ঠতার বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
এ ঘটনায় শফিকুর রহমানের পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল কবির এবং কথিত মধ্যস্থতাকারী আব্দুল ওহাবের নামও এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব পদোন্নতির কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৫ কোটি টাকা বেতন-ভাতা ব্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
৩০ কোটি টাকার সম্পদ—উৎস কোথায় ? শফিকুর রহমানকে ঘিরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, তাঁর নামে এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
এমনকি এসব সম্পদের অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সম্পদের এই হিসাব কিংবা বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের মালিকানা যাচাই প্রয়োজন।
‘সোহেল’ ও ‘মান্নান’ কারা ? কথিত এই চক্রের সঙ্গে ‘সোহেল’ ও ‘মান্নান’ নামে আরও দুজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে সূত্রগুলো। তাঁদের দাবি, সোহেল প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং মান্নান প্রায় ৫০ লাখ টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। তবে তাঁদের পূর্ণ পরিচয়, পদ-পদবি কিংবা কথিত অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্ত ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব নয়।
দুদকের অনুসন্ধান নিয়েও প্রশ্ন : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তের সময় শফিকুর রহমানের নামও আলোচনায় আসে। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক আজিজুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল এলজিইডির বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান, আলী আকতার হোসেনসহ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় শফিকুল ইসলাম ও শফিকুর রহমানকে ঘিরে কথিত প্রভাবশালী চক্রের বিষয়ও সামনে আসে বলে দাবি করা হয়েছে। এলজিইডির ২০১০ সাল থেকে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির নথি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সূত্রগুলো। একই সময়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের কথাও জানা যায়। এমনকি এলজিইডির ৩৬টি কার্যালয়ে একযোগে তল্লাশির কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত অভিযোগ, অনুসন্ধান ও তল্লাশির পর চূড়ান্ত ফলাফল কোথায়? কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কোন অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, কোনটি ভিত্তিহীন—তার স্বচ্ছ তথ্য কেন জনসমক্ষে নেই?
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন : স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশ্ন উঠছে—এলজিইডির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি কি কেবল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে পড়ে থাকবে?
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহায়তায়—১৯৭ কর্মকর্তার পদোন্নতি ফাইল, ১৩৫ কর্মকর্তার পদোন্নতি নথি, ১২ প্রকৌশলীর পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা ও বিধিগত ভিত্তি, সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নের নোটশিট ও অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী ও আয়কর নথি,
কথিত মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা, ২০১০ সাল থেকে নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলির নথি এবং পূর্ববর্তী অনুসন্ধান ও তল্লাশির ফলাফল পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের পেছনে বাস্তবতা আছে কি না, তা অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
‘টাকার বিনিময়ে প্রশাসন’—অভিযোগ সত্য হলে দায় কার ?
এলজিইডির মতো প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সরকারি দায়িত্ব, জনগণের অর্থ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
তাই যোগ্যতার বদলে টাকা, জ্যেষ্ঠতার বদলে প্রভাব এবং বিধির বদলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ যদি সিদ্ধান্তের নিয়ামক হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি দপ্তরের অনিয়ম নয়—রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার জন্যও ভয়াবহ সংকেত।
অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা তদন্তেই নির্ধারিত হোক। কিন্তু অভিযোগ ওঠার পরও যদি কোনো তদন্ত না হয়, নথি যাচাই না হয় কিংবা দায় নির্ধারণের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাবে—এলজিইডিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আসল নিয়ন্ত্রক কে?
বিধি, নাকি কথিত অর্থের চক্র ? শফিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।
নোট: : প্রতিবেদনে উল্লিখিত অর্থ লেনদেন, সম্পদ অর্জন, প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
