গণপূর্তে ‘কমিশন সাম্রাজ্য’ ও প্রভাবের বলয়  : তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কায়কোবাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ, গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের জরুরি তদন্ত দাবি !  

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত চট্টগ্রাম ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক  :  গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বদলি-পদায়ন, কমিশন বাণিজ্য এবং বিপুল সম্পদ অর্জনকে ঘিরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।


বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে তিনি এমন একটি প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, বদলি-পদায়ন এবং আর্থিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারচক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে কায়কোবাদের আওতাধীন বিভিন্ন উন্নয়নকাজ থেকে ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও বিলের পরিমাণের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নজরদারি ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কাজের প্রকৃত অগ্রগতির তুলনায় বেশি বিল প্রস্তুত ও অনুমোদনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে চট্টগ্রাম ই-এম সার্কেল এবং পরবর্তীতে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ই-এম সার্কেল-২-এ দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ই-এম বিভাগ-৫ এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিছু উন্নয়নকাজে প্রকৃত কাজের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ বিষয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগও দিয়েছিল। তবে অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাদের।

কায়কোবাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও নতুন নয়। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের সময়ে তিনি দপ্তরের আর্থিক বিষয় তদারকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

এ কারণে দপ্তরের অভ্যন্তরে তার পরিচিতি তৈরি হয় ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সময়ও তিনি একইভাবে প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হন এবং বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে কায়কোবাদের সম্পদ নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন বিপুল সম্পদের মালিক তিনি। ঢাকার মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট থাকার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া ধামরাই এলাকায় প্রায় ১০ তলা বিশিষ্ট একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, নিজ জেলা শেরপুরেও তার ও পরিবারের নামে-বেনামে জমি ও অন্যান্য সম্পদ থাকার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের ব্যবহারের জন্য দামি গাড়ি থাকার তথ্যও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বড় প্রশ্ন হলো—সরকারি চাকরির আয় দিয়ে এসব সম্পদ অর্জন সম্ভব হয়েছে কি না, সম্পদের উৎস কী, আয়কর নথিতে সঠিক তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না এবং এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা কার নামে রয়েছে।

অভিযোগকারীদের মতে, সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, প্রকল্পের বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই (এমবি), ঠিকাদারি কার্যাদেশ এবং বদলি-পদায়নের নথি যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের বিল অনুমোদন, পরিমাপ, দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারগোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে। এর ফলে সরকারি অর্থের অপচয়, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার ক্ষতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

তবে কায়কোবাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগ এখন পর্যন্ত আদালত বা কোনো তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন ধরেননি। তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের প্রতি সংশ্লিষ্ট মহলের জোর দাবি—মো. কায়কোবাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কমিশন বাণিজ্য, কথিত ভুয়া বিল, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।

প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা সংস্থার সমন্বয়ে একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করে তার ও পরিবারের সম্পদের উৎস, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু একজন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণ নয়, বরং তার সঙ্গে সম্পৃক্ত ঠিকাদার, প্রশাসনিক সহযোগী এবং সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা—সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

👁️ 30 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *