প্রায় ৬০ কোটি টাকার বিপিসি সদর দপ্তরেই নির্মাণ ত্রুটির বিস্ফোরণ: উদ্বোধনের পরদিনই বৃষ্টির পানি, দেয়ালে ফাটল—কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগে তোলপাড় !   জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক  : দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক ভাড়া ভবনে কাটানোর পর অবশেষে নিজস্ব সদর দপ্তর পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। চট্টগ্রামের জয়পাহাড় এলাকায় প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাঁচতলা ইস্পাত কাঠামোর ভবনটি নিয়ে স্বস্তির বদলে শুরুতেই দেখা দিয়েছে অস্বস্তি, ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন।


বিজ্ঞাপন

প্রায় ১৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মস্থল হওয়ার কথা যে ভবনের, সেখানে আনুষ্ঠানিক অফিস শুরুর দিনেই ঢুকেছে বৃষ্টির পানি। কোথাও কোথাও পানি ঠেকাতে ব্যবহার করতে হয়েছে ত্রিপল। এর পরপরই সামনে এসেছে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটলের অভিযোগ।

একটি নতুন সরকারি ভবন, তাও প্রায় ৬০ কোটি টাকার প্রকল্প—অথচ অফিস শুরুর প্রথম দিনেই যদি বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ে এবং দেয়াল-সংযোগস্থলে ফাটল দেখা দেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে: নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণে কী হয়েছে? প্রকল্প তদারকি হয়েছে কীভাবে? আর এত টাকা খরচ করে নির্মিত ভবন বুঝে নেওয়ার আগে কারা এসব ত্রুটি যাচাই করেছেন?


বিজ্ঞাপন

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। ভবনের দৃশ্যমান ত্রুটির পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন ঘিরে উঠেছে ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন ও কমিশন-বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ও বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) প্রকৌশলী মো. আপেল মামুন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই হয়নি, তবে অভিযোগগুলো এতটাই গুরুতর যে প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও আর্থিক তদন্ত ছাড়া বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই।


বিজ্ঞাপন

অফিস শুরুর দিনেই পানি—প্রায় ৬০ কোটি টাকার ভবনে এমন দশা কেন ? গত ১০ জুলাই নতুন ভবনে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১২ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অফিস কার্যক্রম শুরু হয়। আর অফিস শুরুর দিনেই বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ে ভবনের কয়েকটি কক্ষে। পানি ঠেকাতে কোথাও কোথাও ত্রিপল ব্যবহারের খবরও পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন হলো—ভবনটি যদি অফিস শুরুর উপযোগী করেই হস্তান্তর করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রথম বৃষ্টিতেই পানি প্রবেশ করল কীভাবে? কাচের সংযোগস্থল, সিলিং, জানালা কিংবা অন্যান্য অংশে পানি প্রতিরোধের ব্যবস্থা যথাযথভাবে করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন খতিয়ে দেখা জরুরি।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আপেল মামুন পানি প্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, ভবনের কাচে বিশেষ ধরনের আঠা ব্যবহার না করায় বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকেছে।

এই বক্তব্যই বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—একটি নতুন সরকারি ভবনের কাচে প্রয়োজনীয় বিশেষ আঠা ব্যবহার করা হয়নি কেন? নির্মাণকাজ চলাকালীন প্রকৌশলী, তদারকি কর্মকর্তা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি দেখেননি কেন? আর কাজ শেষ হওয়ার পর

ভবন বুঝে নেওয়ার আগে ত্রুটিপূর্ণ অংশ শনাক্ত করা হলো না কেন ?  পানি ঢোকার পরই ফাটল—নির্মাণমান নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
বৃষ্টির পানি প্রবেশের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এসেছে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটলের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভবনের উত্তর পাশে অন্তত তিনটি স্থানে ফাটল দেখা গেছে। এর আগেও ভবনের কয়েকটি অংশে ফাটল দেখা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। পরে সেসব জায়গায় পুডিং ও প্লাস্টার করে মেরামত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে প্রকল্প পরিচালক আপেল মামুনের দাবি, ইস্পাত কাঠামোর ভবনে ইস্পাত ও সিমেন্টের সংযোগস্থলে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে। এগুলো বড় ধরনের কাঠামোগত সমস্যা নয় এবং পুডিং ও প্লাস্টারের মাধ্যমে মেরামত করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া ইউনাইটেড করপোরেশনের মালিক মো. আমিনও ফাটলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইস্পাত কাঠামোর কারণে কিছু জায়গায় ফাটলের মতো দেখা দিয়েছে এবং সেগুলো পুডিং করে ঠিক করা হচ্ছে। এতে ভবনের মূল কাঠামোর ক্ষতি হবে না বলেও তিনি দাবি করেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—ফাটল কেন দেখা দিয়েছে, সেটি অনুমানের ভিত্তিতে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া হবে, নাকি স্বাধীন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করানো হবে?
প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি ভবনের ক্ষেত্রে শুধু পুডিং-প্রলেপ দিয়ে ফাটল ঢেকে দেওয়া যথেষ্ট কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

অভিযোগের কেন্দ্রে প্রকল্প পরিচালক—কমিশন-বাণিজ্যের তদন্ত হবে কি ?  ভবনের দৃশ্যমান ত্রুটির পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন ঘিরে উঠেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, ভবন নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আপেল মামুনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং নির্মাণকাজের বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়ার বদলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা জরুরি।
বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালক যদি সত্যিই ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন—তাহলে সেটি শুধু একটি ভবনের নির্মাণ ত্রুটি নয়; এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প তদারকি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার ওপর সরাসরি আঘাত।

এ কারণে তদন্তের আওতায় শুধু প্রকল্প পরিচালক নন, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, তদারকি কর্মকর্তা, পরামর্শক, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, বিল অনুমোদনকারী এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকাও যাচাই করা প্রয়োজন।

৩৫ বছরের অপেক্ষার পর ‘নিজস্ব ভবন’—শুরুতেই কেন এই বিতর্ক ?  বিপিসি প্রায় ১৯৯০ সাল থেকে চট্টগ্রামে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রথমে আগ্রাবাদের হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনে এবং পরে ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ভবনে সদর দপ্তরের কার্যক্রম চলে।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সদর দপ্তর নির্মিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল—আধুনিক, টেকসই ও নিরাপদ একটি ভবনের মাধ্যমে বিপিসির দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের অবসান হবে।
কিন্তু অফিস শুরুর পরপরই পানি প্রবেশ, ফাটল এবং নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সেই প্রত্যাশার জায়গায় এখন তৈরি হয়েছে সংশয়।

তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি  :  প্রায় ৬০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে অনিয়ম বা গাফিলতির অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে শুধু ভবনের ফাটল দেখলেই হবে না। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ কারিগরি, প্রশাসনিক ও আর্থিক অডিট। তদন্তে অন্তত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো যাচাই করা জরুরি— প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ও প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব; দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন প্রক্রিয়া; কার্যাদেশের শর্ত ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি; ভবনের নকশা ও নকশা অনুযায়ী নির্মাণ হয়েছে কি না;
ব্যবহৃত ইস্পাত, সিমেন্ট, কাচ, আঠা ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর মান; পানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না; ফাটলের প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে স্বাধীন প্রকৌশল পরীক্ষা; কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া; প্রকল্প পরিচালক ও তদারকি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন; ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন;, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা কমিশন লেনদেন হয়েছে কি না, ভবন হস্তান্তরের আগে ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের প্রক্রিয়া।

জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভবন—জবাবদিহি চাই  :  বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মাধ্যমে এসব জ্বালানি বাজারজাত করা হয়। পাশাপাশি বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের কাজও হয়।

এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর নির্মাণে যদি নির্মাণ ত্রুটি, তদারকির দুর্বলতা কিংবা কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটিকে ‘ছোটখাটো ত্রুটি’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি—অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। প্রয়োজন হলে প্রকল্পের নকশা, নির্মাণসামগ্রী ও কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে বুয়েট বা অন্য কোনো স্বনামধন্য সরকারি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হোক। একই সঙ্গে প্রকল্পের দরপত্র থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার ফরেনসিক আর্থিক ও প্রশাসনিক যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের সত্যতা মিললে সরকারি অর্থের অপচয়, নির্মাণে অনিয়ম কিংবা দায়িত্বে গাফিলতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি ভবনের দেয়ালে ফাটল কিংবা কয়েকটি কক্ষে বৃষ্টির পানি ঢোকার নয়। প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্রের প্রায় ৬০ কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত একটি ভবন যদি অফিস শুরুর দিনেই ত্রুটির মুখে পড়ে, তাহলে সেই টাকার প্রতিটি পয়সার জবাবদিহি করবে কে?

👁️ 32 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *