কাগজে উন্নয়ন, মাঠে শূন্য—এলজিইডির হাজার কোটি লুটের শেষ ঠিকানা ‘মিরাজ দম্পতির সাম্রাজ্য’

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  কাগজে ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের পর প্রকল্প। গ্রামবাংলার রাস্তা, কালভার্ট, সেতু আর অবকাঠামো বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবে কোথাও নেই কাজের চিহ্ন। অথচ সরকারি কোষাগার থেকে বেরিয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকা।


বিজ্ঞাপন

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—এই বিপুল অর্থের শেষ গন্তব্য পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মিরাজুল ইসলাম মিরাজ ও তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তারের ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের পাহাড়। ২৮০০ কোটি টাকার ‘অদৃশ্য প্রকল্প’

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, গত এক দশকে মিরাজ দম্পতি চারটি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে এলজিইডির একাধিক প্রকল্পের বিল উত্তোলন করেন। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই।


বিজ্ঞাপন

এই কাগুজে প্রকল্প দেখিয়ে তাঁরা আত্মসাৎ করেছেন প্রায় ২৮০০ কোটি টাকা। ৯টি ব্যাংকের মাধ্যমে হয়েছে অন্তত ২,৬৭৯ কোটি টাকা স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর—যা তদন্তকারীদের মতে পরিকল্পিত মানিলন্ডারিংয়ের স্পষ্ট আলামত।


বিজ্ঞাপন

দুদকের মামলা : মানিলন্ডারিং ও জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আজ বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি দুদক পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে দম্পতির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে। মামলা দায়ের করেন সহকারী পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম।

সম্পদের পাহাড়, আয়ের খাতায় ফাঁক : দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে— মিরাজুল ইসলামের নামে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান, ব্যাংক আমানত, কোম্পানির শেয়ার ও ৯টি গাড়িসহ মোট সম্পদের মূল্য ১১৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। কিন্তু তাঁর গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস মাত্র ১৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৯৯ কোটি টাকা জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

স্ত্রীর হিসাবেও একই ছক : স্ত্রী শামীমা আক্তার— মেসার্স শিমু এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্সধারী ঠিকাদার। তাঁর নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৩২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। গ্রহণযোগ্য আয় মাত্র ৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

অর্থাৎ প্রায় ২৪ কোটি টাকা আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। আরও ভয়াবহ তথ্য— তাঁর ব্যাংক হিসাবে সরকারি অর্থ সংশ্লিষ্ট ১২২ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে, যা মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে দুদকের অভিযোগ।

রাজনীতির ছায়ায় লুটের নিরাপদ ছাতা  :  মিরাজুল ইসলাম হলেন প্রভাবশালী রাজনীতিক মহিউদ্দীন মহারাজের ভাই। মহারাজ বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা একজন সংসদ সদস্য। স্থানীয় রাজনীতি ও প্রশাসনের শক্ত বলয়ের কারণে এত বড় অঙ্কের প্রকল্প বিল উত্তোলন এবং তদারকির অনুপস্থিতি নিয়েও দীর্ঘদিন কেউ মুখ খুলতে পারেনি—এমনটাই বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

প্রশ্নের মুখে এলজিইডি ও প্রশাসনিক তদারকি : দুদকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে— প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াই বিল ছাড়,কোনো মাঠপর্যায়ের যাচাই না থাকা, এবং বিপুল ব্যাংকিং লেনদেন— সব মিলিয়ে এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটের সুসংগঠিত মডেল। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে —এলজিইডির প্রকল্প অনুমোদন ব্যবস্থা কীভাবে পাশ হয়েছে? বিল ছাড়ের সময় মাঠপর্যায়ের যাচাই কোথায় ছিল? স্থানীয় প্রশাসন ও অডিট বিভাগ কেন নীরব ছিল?

দুদকের বক্তব্য : দুদক উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন— “তদন্ত চলমান রয়েছে। অনুসন্ধানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শেষ কথা : গ্রামবাংলার নামে উন্নয়ন, গরিব মানুষের অধিকারী অর্থ, আর রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য উন্নয়ন সাম্রাজ্য।

কাগজে রাস্তা, মাঠে শূন্যতা—আর ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা।
এটাই এখন দুদকের ভাষায়— ‘মিরাজ-শামীমা মানিলন্ডারিং মডেল’। তদন্ত শেষ হলে এই লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত আরও অনেক নাম উঠে আসতে পারে— এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

👁️ 24 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *