যে সংস্থাটি জন্ম নিয়েছিল নিরাপত্তার অজুহাতে : আজ কেন সেই সংস্থাই আমেরিকানদের আতঙ্ক ?

Uncategorized আইন ও আদালত আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন মানবিক খবর সংগঠন সংবাদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :   ICE: নিরাপত্তা না কি রাষ্ট্রীয় ভয় ? যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে যুগের পর যুগ ধরে “মানবাধিকার”, “গণতন্ত্র” ও “আইনের শাসন”-এর বিশ্ব শিক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। অথচ সেই যুক্তরাষ্ট্রেই আজ এমন এক ফেডারেল সংস্থা কাজ করছে, যাকে ঘিরে ভয়, ক্ষোভ আর লজ্জায় ফুঁসছে খোদ মার্কিন নাগরিকরাই।


বিজ্ঞাপন

সেই সংস্থার নাম— ICE (Immigration and Customs Enforcement)। যে সংস্থাটি তৈরি হয়েছিল আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে, আজ সেই সংস্থাই কেন সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বে।

৯/১১-এর পর জন্ম, কিন্তু লক্ষ্য বদলের অভিযোগ   : ICE গঠিত হয় ২০০৩ সালে, তবে এর বীজ রোপিত হয়েছিল তারও আগে—২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, নিউইয়র্কে সংঘটিত ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র “জাতীয় নিরাপত্তা”কে সামনে রেখে অভিবাসন আইনকে আরও কঠোর করার পথে হাঁটে।


বিজ্ঞাপন

সেই ধারাবাহিকতায় Department of Homeland Security (DHS)–এর অধীনে জন্ম নেয় ICE।, অনেকে মনে করেন, Donald Trump এসে ICE বানিয়েছে—এটা সত্য নয়। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে ট্রাম্পের শাসনামলে ICE এক ভয়ংকর রূপ নেয়, আর তার দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় আসার পর সেই রূপ আরও নগ্নভাবে সামনে আসে।


বিজ্ঞাপন

বাজেটের বিস্ফোরণ  : নিরাপত্তা না কি দমনযন্ত্র  ?  মাত্র এক দশক আগেও ICE–এর বার্ষিক বাজেট ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের নিচে। বহু বছর ধরে এই বাজেট ১০ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছিল।

কিন্তু গত জুলাইয়ে কার্যকর হওয়া বিতর্কিত One Big Beautiful Bill Act-  এর পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ICE-এর বাজেট হঠাৎ করে লাফিয়ে প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়, এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি অর্থায়নপ্রাপ্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। প্রশ্ন উঠছে— এই বিপুল অর্থ কি সত্যিই নিরাপত্তার জন্য, নাকি এটি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার লাইসেন্স?

কাগজে আইন, বাস্তবে বর্বরতা : আইনের খাতায় ICE–এর কাজ খুব সরল—অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা, গ্রেফতার করা এবং ডিপোর্ট করা। এমন কাজ অতীতেও হয়েছে। এমনকি ওবামা প্রশাসনও অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠিয়েছে। কিন্তু পার্থক্যটা এখানেই— তখন ছিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, এখন অভিযোগ উঠছে প্রকাশ্য বর্বরতার।

বর্তমানে ICE এজেন্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ— বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার, প্রকাশ্যে মানুষকে হেনস্তা, পরিবার বিচ্ছিন্ন করা, নিরস্ত্র নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ, এমনকি অভিযোগ রয়েছে, ICE এজেন্ট চাইলে এখন একজন নিরস্ত্র মানুষকেও গুলি করতে পারে, আর এরপর পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র সেই কর্মকর্তাকে রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

‘ক্রিমিনাল নই’, তবুও গ্রেফতার :  উপলব্ধ তথ্যে দেখা যাচ্ছে— ৭৫ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ডই নেই এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, ICE এখন আর কেবল “অপরাধী” খুঁজছে না—বরং চেহারা, ভাষা, পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে সন্দেহ করছে।

নেটিভ আমেরিকানও রেহাই পায়নি  ! এই দমননীতির ভয়াবহতার এক চাঞ্চল্যকর উদাহরণ— জনপ্রিয় সিরিজ Northern Exposure–এ অভিনয় করা এক নেটিভ আমেরিকান অভিনেত্রী জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটলে তাকে ICE কর্মকর্তারা আটক করতে চেয়েছিলেন, কারণ? তার ট্রাইবাল পরিচয়পত্র “নকল মনে হয়েছে” যে দেশে আদিবাসীরা সবচেয়ে পুরোনো নাগরিক, সেই দেশেই আজ তাদের পরিচয়পত্র সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে!

ডিটেনশন সেন্টার: আধুনিক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ?  ICE–এর ডিটেনশন সেন্টারগুলো নিয়েও উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ। গত বছর সেখানে ৩০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষায়—“এগুলো ডিটেনশন সেন্টার নয়, এগুলো ধীরে মৃত্যুর কারাগার।”

রাষ্ট্র বনাম নাগরিক: প্রতিবাদের আগুন : এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে এখন রাস্তায় নামছে খোদ আমেরিকানরাই— ICE বিলুপ্তির দাবি, ফান্ড বন্ধের দাবি, ব্যাপক সংস্কারের আহ্বান Homeland Security প্রধানকে অপসারণের দাবি, X (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য মার্কিন নাগরিক লিখছেন “We are ashamed of ICE.” কিন্তু এই জনমতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে— ট্রাম্প প্রশাসন আরও ফান্ড বাড়ানোর কথা বলছে, ICE–এর সব কর্মকাণ্ডে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে দ্বিচারিতা নাকি নতুন সাম্রাজ্যবাদ?

যে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশকে মানবাধিকার শেখায়, যে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেই যুক্তরাষ্ট্রই আজ নিজের দেশে এমন এক বাহিনীকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে— যার বিরুদ্ধে, নির্যাতন, মৃত্যুর, বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ পাহাড়সম। এটাই কি যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত “Rules-Based Order”?

উপসংহার : ICE আজ আর শুধু একটি ইমিগ্রেশন সংস্থা নয়।
এটি হয়ে উঠেছে— রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেপরোয়া প্রদর্শন, মানবাধিকারের মুখোশখোলা প্রতিচ্ছবি, আমেরিকান গণতন্ত্রের অন্ধকার আয়না। যে সংস্থাটি তৈরি হয়েছিল আমেরিকার সুরক্ষার জন্য, আজ সেই সংস্থাই কেন আমেরিকানদের আতঙ্ক— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্ব আজ দেখছে, নিরাপত্তার অজুহাতে কীভাবে একটি রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

👁️ 27 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *