বদলি হলেই রাজনৈতিক তদবীর, এক যুগ একই কর্মস্থল : খুলনা গণপূর্তে আওয়ামী ঠিকাদার শওকত–প্রকৌশলী সাইফুলের সিন্ডিকেট লুটপাটের অদৃশ্য সাম্রাজ্য !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত খুলনা জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  খুলনা গণপূর্ত বিভাগ–১ যেন কোনো সরকারি দপ্তর নয়—বরং এক দশকের বেশি সময় ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম—যিনি বদলি হলেই রাজনৈতিক তদবীর, অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বারবার ফিরে এসেছেন একই কর্মস্থলে। ১২ বছর একই জায়গায়—কীভাবে সম্ভব?


বিজ্ঞাপন

২০১৪ সাল থেকে টানা ১২ বছরেরও বেশি সময় খুলনা গণপূর্ত বিভাগ–১-এ অবস্থান করছেন মো. সাইফুল ইসলাম। সরকারি চাকরির বদলি নীতিমালাকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি খুলনাকেই নিজের স্থায়ী কর্মক্ষেত্রে রূপ দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি ফ্যাসিস্ট শাসনের ছত্রছায়ায় থেকে নামে–বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার ‘গডফাদার’ হিসেবে কাজ করেছেন শেখ পরিবারের অতিঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী ঠিকাদার, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক আশ্রয় নিশ্চিত করা হয়।


বিজ্ঞাপন

শেখ পরিবারের ছত্রছায়ায় ভয় ও দখলের রাজনীতি : অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল এবং খুলনা মহানগর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজনের বাগিয়ে নেওয়া গণপূর্তের কাজগুলো মাঠপর্যায়ে তত্ত্বাবধান করতেন সাইফুল ইসলাম। একইসঙ্গে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের ওপর ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে পুরো দপ্তরকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।


বিজ্ঞাপন

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : কোটি টাকার বরাদ্দ, বেহাল অবস্থা , দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অথচ হাসপাতালের চারটি ব্লকের ভেতরের অবকাঠামো, ওয়াশরুম, ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা আজ চরম বেহাল।

প্রতি বছর— গণপূর্তের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারের স্বাস্থ্য খাতের বিশেষ বরাদ্দ, বিশ্বব্যাংকের বিশেষ অনুদান থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কাজের কোনো দৃশ্যমান ফল নেই।

একই কাজ বারবার, ভুয়া বিলের উৎসব : টেন্ডার শিডিউল পর্যালোচনায় দেখা গেছে— একই কাজ বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখানো হয়েছে, অনেক কাজ বাস্তবায়ন না করেই ভুয়া বিল সাবমিট, মেজারমেন্ট বুক এন্ট্রি ছাড়াই বিল উত্তোলন, এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে এসেছে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের নাম।

অঢেল সম্পদের পাহাড় : অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সাইফুল ইসলামের সম্পদের তালিকা ভয়াবহ— পটুয়াখালীর বাউফলে (হোল্ডিং নং-২৬৪) দৃষ্টিনন্দন ভবন, গ্রামে প্রায় ১৫ বিঘা জমি, বরিশালে বহুতল ভবন, খুলনার নিরালা আবাসিক এলাকা ও ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ সবকিছুই সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।।

বদলির নাটক: ৪ মাসে ৩ বার ফেরত : নভেম্বর ২০২০,  বাগেরহাটে বদলি, মাত্র ২ মাসে রাজনৈতিক তদবিরে পুনরায় খুলনায় প্রত্যাবর্তন, ১০ জুলাই ২০২৫: ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–১, ২২ অক্টোবর ২০২৫: ঢাকার রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ, এবং ৯ নভেম্বর ২০২৫: আবার খুলনায় প্রত্যাবর্তন, চার মাসে দুই দফা বদলি বাতিল ও পুনর্বহালে ৩০ লাখ টাকার বেশি তদবির খরচ হয়েছে বলে তিনি নিজেই বন্ধু মহলে স্বীকার করেছেন।

বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ : এফএপিএডি (FAPAD) অডিট টিম ‘কোভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া : প্রকল্প’ পরিদর্শনে গিয়ে— ইজিপি-৯১৭৩৪০ ও ইজিপি-৯২৪৯২৪ এই দুই প্রকল্পে ৪৪ লাখ ১০ হাজার ৫১ টাকা আত্মসাতের লিখিত আপত্তি তোলে। ১৮/০৯/২০২৫ তারিখে অডিট কর্মকর্তা কৈলেশ চন্দ্র দাসের স্বাক্ষরিত নথিতে এই অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

ঠিকাদারের স্বীকারোক্তি : এস এন বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী জানান— “নকশাবহির্ভূত ও অস্বাভাবিক এস্টিমেট নিয়ে প্রশ্ন তুললে সাইফুল ইসলাম ঘাঁটাঘাঁটি না করতে বলেন। তিনি যতটুকু দেখিয়েছেন, ততটুকুই কাজ করেছি।”

১৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ঝুঁকিতে : খুলনা গণপূর্ত বিভাগ–১-এর আওতায়— ১৭ তলা ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র ও ২২টি প্যাকেজে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা। এই বিশাল প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের সুপারভিশনের দায়িত্বে রয়েছেন সাইফুল ইসলাম।

অভিযোগ রয়েছে কাজ শেষ না করেই অগ্রিম বিল পরিশোধ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী , দরজার কাঠে বার্মাটিক থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন, একাধিক ঠিকাদারের ভাষায়, “এই প্রকৌশলীর হাতে প্রকল্প নিরাপদ নয়।”

শওকত–সাইফুল সিন্ডিকেট : ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ভাতিজা শেখ সুজনের ম্যানেজার শওকতকে সামনে রেখে সাইফুল ইসলাম খুলনায় ঘাঁটি গেড়েছেন। বর্তমানে বিএনপি নেতা লাভু বিশ্বাসের ছত্রছায়ায় থেকেও এই সিন্ডিকেট বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ।

খুলনাবাসীর প্রশ্ন : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলেও—কীভাবে একজন ফ্যাসিস্ট দোসর, এক যুগ ধরে একই কর্মস্থলে বারবার বদলি বাতিল করে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ন্ত্রণে রাখেন? খুলনাবাসী এখন গণপূর্ত উপদেষ্টা, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

👁️ 109 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *